ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কোনও সুরাহা না হওয়া সত্ত্বেও তেল পরিবহনের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী গোপনে হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে একটি নৌ-চলাচল পথ বা করিডোর চালু করেছে। ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios)-এর প্রতিবেদনে দুজন মার্কিন কর্তার বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কোনও সুরাহা না হওয়া সত্ত্বেও তেল পরিবহনের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী গোপনে হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে একটি নৌ-চলাচল পথ বা করিডোর চালু করেছে। ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios)-এর প্রতিবেদনে দুজন মার্কিন কর্তার বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ট্রাম্প যখন ইরানের সঙ্গে ৬০ দিনের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তির মেয়াদ না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, তার কয়েক দিনের মধ্যেই এই পদক্ষেপটি নেওয়া হয়। ট্রাম্প তখন বলেছিলেন যে হরমুজ প্রণালী খোলা রয়েছে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের উপর আমেরিকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই কার্যক্রম চলছে। প্রতি রাতে ওমানের উপকূল ঘেঁষে থাকা একটি দক্ষিণমুখী চ্যানেলের মধ্য দিয়ে ১৫-২০টি ট্যাঙ্কার এই প্রণালীতে প্রবেশ করছে এবং বেরিয়ে যাচ্ছে। কর্তাদের মতে, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিশ্ববাজারে পাঠানো হচ্ছে—যা যুদ্ধের আগের পরিমাণের প্রায় অর্ধেক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এই কার্যক্রমটি কেবল তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মার্কিন সামরিক বাহিনী খালি ট্যাঙ্কারগুলোকে আরব সাগর থেকে হরমুজ হয়ে উপসাগরীয় বন্দরগুলোতে তেল সংগ্রহের জন্য যেতে এবং সেখান থেকে তেল নিয়ে পুনরায় প্রণালীটি অতিক্রম করে ফিরে আসতেও সহায়তা করছে। নর্থ ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগে অবস্থিত মার্কিন সেনাবাহিনীর সদর দফতরে থাকা একটি টাস্ক ফোর্স উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ট্যাঙ্কারগুলোকে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী আসা-যাওয়ার জন্য বিভিন্ন বহরে (কনভয়) ভাগ করা হয়েছে এবং সেগুলো মার্কিন সামরিক বাহিনীর নির্দেশে দক্ষিণমুখী চ্যানেলটি ব্যবহার করছে।
ইরানের রাডার ও সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত
মার্কিন কর্তারা জানিয়েছেন, ‘ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড’-এর সাম্প্রতিক দুই সপ্তাহের একটি অভিযানের ফলে ইরানের রাডার ও সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়েছে। এছাড়া ইরানের ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইলের হুমকি মোকাবিলায় মার্কিন বিমান বাহিনীও নিরাপত্তা সহায়তা দিচ্ছে। মার্কিন কর্তাদের মতে, দক্ষিণমুখী চ্যানেল দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের উপর নজর রাখার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা এখন সীমিত হয়ে পড়েছে। তারা কেবল মেরামত করা কয়েকটি রাডার এবং ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড’-এর ছোট নৌকায় থাকা পর্যবেক্ষকদের উপর নির্ভর করছে। তাঁরা আরও জানান, ইরানি বাহিনী সন্দেহভাজন নৌ-পথ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মার্কিন বাহিনী অনেক মিসাইল ও ড্রোন মাঝপথেই ধ্বংস বা প্রতিহত করেছে।
প্রতি রাতে ১৫-২০টি ট্যাঙ্কার এই প্রণালী অতিক্রম করেছে
গত দুই সপ্তাহে প্রতি রাতে ১৫-২০টি ট্যাঙ্কার এই প্রণালী অতিক্রম করেছে এবং বর্তমানে দৈনিক গড় তেল রফতানির পরিমাণ ১ কোটি ব্যারেলের কাছাকাছি পৌঁছেছে। মার্কিন কর্তাদের তথ্যমতে, কোনও কোনও দিন এই রফতানির পরিমাণ ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি ব্যারেল পর্যন্তও পৌঁছেছে। এই কার্যক্রম যুদ্ধের অন্যতম বড় একটি অর্থনৈতিক প্রভাব—অর্থাৎ বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহনে বিঘ্ন ঘটার সমস্যা—কিছুটা লাঘব করতে সহায়তা করেছে। তবে তেলের প্রবাহ এখনও যুদ্ধের আগের মাত্রার নীচে রয়েছে। বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios)-কে বলেছেন, “হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল বেরিয়ে আসছে।” একইসঙ্গে তিনি জানান যে, ওয়াশিংটন বর্তমানে ইরানের সঙ্গে কোনও আলোচনা করছে না।
ট্রাম্প কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটিকে মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবেও ঘোষণা করেছেন
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালী একটি প্রধান সংঘাতপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। এই জলপথটি খোলা নাকি কার্যত অবরুদ্ধ—তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবির মাঝে এর মধ্য দিয়ে চলাচল বারবার ব্যাহত হয়েছে। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটিকে মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবেও ঘোষণা করেছেন। বিশ্বের তেল সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংকীর্ণ পথ (চোকপয়েন্ট) হল এই প্রণালী। এর মাধ্যমেই বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ এবং বিশ্ববাজারে কেনাবেচা হওয়া তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিবাহিত হয়। এছাড়া প্রতিদিন প্রায় ১১.৪ বিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি (LNG)-ও এর মধ্য দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল বারবার ব্যাহত হয়েছে। আমেরিকা দাবি করছে জলপথটি খোলা রয়েছে, অন্যদিকে ইরান বলছে এটি অবরুদ্ধ। বুধবার রয়টার্স জানিয়েছে যে, মঙ্গলবার মাত্র ছয়টি পণ্যবাহী জাহাজ এর মধ্য দিয়ে চলাচল করেছে, যা স্বাভাবিক চলাচলের তুলনায় অত্যন্ত কম।


