শরীরের প্রকৃত বা বায়োলজিক্যাল এজ অনেক সময় ক্যালেন্ডারের বয়সের সঙ্গে মিলেও না। আর সেই বয়স বোঝার জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন প্রযুক্তি—ট্রান্সক্রিপটোমিক ক্লক। কী এই রক্ত পরীক্ষা? এবং কতটা সত্যি…..

প্রতি বছর জন্মদিনে কেক কেটে আমরা বয়স এক বছর বাড়ার হিসাব করি। কিন্তু ক্যালেন্ডারের বয়স কি সত্যিই শরীরের বয়সের সঠিক প্রতিচ্ছবি? সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। বিজ্ঞানীদের মতে, শরীরের প্রকৃত বা বায়োলজিক্যাল এজ অনেক সময় ক্যালেন্ডারের বয়সের সঙ্গে মিলেও না। আর সেই বয়স বোঝার জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন প্রযুক্তি—ট্রান্সক্রিপটোমিক ক্লক।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, DNA আমাদের শরীরের স্থায়ী নকশা বা নির্দেশিকা, আর RNA হলো সেই নির্দেশনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে তার প্রতিফলন। অর্থাৎ কোন জিন কখন এবং কতটা সক্রিয় থাকবে, তা অনেকটাই RNA-এর কার্যকলাপের মাধ্যমে বোঝা যায়।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে কিছু জিনের কার্যকলাপ বেড়ে যায়, আবার কিছু জিন কম সক্রিয় হয়ে পড়ে। যেমন, প্রদাহ (Inflammation)-সংশ্লিষ্ট জিনের কার্যকলাপ বাড়তে পারে, অন্যদিকে কোষ মেরামতের সঙ্গে যুক্ত জিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। হাজার হাজার জিনের এই পরিবর্তিত কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করেই গবেষকেরা শরীরের জৈবিক বয়স বা বায়োলজিক্যাল এজ নির্ধারণের চেষ্টা করছেন।

একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় কয়েক হাজার মানুষের রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, যাদের বায়োলজিক্যাল এজ তাদের প্রকৃত বয়সের তুলনায় বেশি ছিল, তাদের মধ্যে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গিয়েছে। গবেষণায় আরও ইঙ্গিত মিলেছে যে, ধূমপান, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের মতো বিষয়গুলো শরীরের জৈবিক বার্ধক্য দ্রুততর করতে পারে।

অন্যদিকে নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে তুলনামূলক ধীরগতির জৈবিক বার্ধক্যের সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে।

না। বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এটি কোনও 'ডেথ প্রেডিক্টর' নয়। এটি মূলত একটি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট টুল, যা ভবিষ্যতে বিভিন্ন রোগ হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। যেমন উচ্চ কোলেস্টেরল থাকলেই হার্ট অ্যাটাক হবেই—এমন নয়; তবে ঝুঁকি বেড়ে যায়। একইভাবে বায়োলজিক্যাল এজ বেশি হলে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।

কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন শরীরের বার্ধক্যের গতি কমাতে সাহায্য করতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পরিমিত ক্যালোরিযুক্ত খাদ্যাভ্যাস এবং ধূমপান বর্জনের মতো অভ্যাস শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নত করে। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে "২–৩ বছর বয়স কমে যায়"—এ ধরনের দাবি এখনও সব গবেষণায় একইভাবে প্রমাণিত হয়নি।

ইউএস কয়েকটি দেশে গবেষণা ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের বায়োলজিক্যাল এজ টেস্ট চালু হয়েছে। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে বায়োলজিক্যাল এজ, বয়স বৃদ্ধির গতি এবং কিছু ক্ষেত্রে অঙ্গভিত্তিক বয়সের আনুমানিক হিসাব দেওয়া হয়। তবে এগুলোর নির্ভুলতা ও ব্যবহার নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।

এই প্রযুক্তি নিয়ে বেশ কিছু উদ্বেগও রয়েছে।

গোপনীয়তা: স্বাস্থ্যবিমা বা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান যদি এই তথ্য ব্যবহার করে, তাহলে বৈষম্যের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

মানসিক প্রভাব: নিজের শরীরের বয়স বেশি জেনে অনেকেই উদ্বেগ বা হতাশায় ভুগতে পারেন।

নির্ভুলতা: এই ধরনের পরীক্ষা এখনও শতভাগ নির্ভুল নয়। তাই শুধু একটি রিপোর্টের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

ভারতে কী হচ্ছে?

ভারতের গবেষকেরাও ভারতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা এজিং ক্লক তৈরির কাজ করছেন। কারণ ইউরোপ বা আমেরিকার জনগোষ্ঠীর জিনগত বৈশিষ্ট্য, খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ ও জীবনযাত্রা ভারতীয়দের থেকে অনেকটাই ভিন্ন। ফলে স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি মডেল আরও কার্যকর হতে পারে।

এই ধরনের উন্নত পরীক্ষা সবার নাগালে না থাকলেও সুস্থ থাকার মূল নিয়মগুলো একই রয়ে গেছে—

বছরে অন্তত একবার রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল, BMI, লিভার ও কিডনির পরীক্ষা করান।

প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন বা শরীরচর্চা করুন।

প্রতিদিন ৭–৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন।

ধূমপান ও অতিরিক্ত চিনি এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন।

মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকা অনেকটাই নির্ভর করে আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের ওপর। বায়োলজিক্যাল এজিং নিয়ে নতুন গবেষণাগুলো সেই সত্যটিকেই আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরছে।