ইউরোপ জুড়ে অস্বাভাবিক খরার কারণে ড্যানিউব, রাইন সহ বড় নদীর জলস্তর কমে গেছে। তাতেই প্রকাশ্যে এসেছে প্রাগৈতিহাসিক ম্যামথের কঙ্কাল, রোমান শহরের ধ্বংসাবশেষ আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মান যুদ্ধজাহাজ।
গত কয়েক বছরে ইউরোপে যে ভয়াবহ খরা হয়েছে, তার ফলে রাইন, ড্যানিউব, পো-এর মতো বড় বড় নদীর জল প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। বিজ্ঞানীদের কাছে এটা জলবায়ু পরিবর্তনের সতর্কবার্তা হলেও, প্রত্নতত্ত্ববিদ আর ইতিহাসবিদদের কাছে এটা একটা বিশাল সুযোগ। কারণ নদীর জল সরে যেতেই মাটির তলায় চাপা পড়ে থাকা ইতিহাস নিজে থেকেই ভেসে উঠছে।
সবচেয়ে চমকে দেওয়ার মতো আবিষ্কার হয়েছে হাঙ্গেরির ড্যানিউব নদীতে। জল এতটাই কমে গেছে যে নদীর বুক থেকে বেরিয়ে এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডুবে যাওয়া জার্মান নৌবাহিনীর ডজন খানেক যুদ্ধজাহাজ। ১৯৪ সালে সোভিয়েত বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে জার্মানরা নিজেরাই এই জাহাজগুলো ডুবিয়ে দিয়েছিল। প্রায় ৮০ বছর পর জলের নিচ থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে সেই মরচে ধরা যুদ্ধজাহাজগুলো। জায়গাটা এখন একটা ওপেন এয়ার মিউজিয়ামের মতো।
শুধু যুদ্ধের ইতিহাস না, আরও অনেক পুরোনো ইতিহাসও বেরিয়ে এসেছে। সার্বিয়ার ড্যানিউব নদীর পাড়ে খরার সময় দেখা মিলেছে "রোমান শহর"-এর। প্রায় ১৮০ বছর আগের এই শহর সাধারণত জলের নিচেই থাকে। শহরের রাস্তা, বাড়ির ভিত, এমনকি রোমান সৈন্যদের কবরও দেখা গেছে।
আরও অবাক করা ঘটনা ঘটেছে চেক প্রজাতন্ত্রে। সেখানকার একটি নদীর পাড় থেকে উদ্ধার হয়েছে প্রায় ১০ হাজার বছরের পুরোনো উলি ম্যামথের দাঁত আর হাড়ের টুকরো। বিজ্ঞানীদের ধারণা বরফ যুগে এই এলাকাটা ম্যামথদের বিচরণক্ষেত্র ছিল। নদীর জল কমে যাওয়ায় মাটি ক্ষয় হয়ে সেই জীবাশ্মগুলো উপরে উঠে এসেছে।
ইতালির পো নদীতেও একই দৃশ্য। জলস্তর এতটাই নেমেছে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি বোমা বেরিয়ে এসেছে। পাশাপাশি উঠে এসেছে ১৬০ সালের একটি গির্জার ধ্বংসাবশেষ। যে গির্জাটা ১৯৫০ সালে একটি বাঁধ তৈরির সময় জলে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এগুলো কেন হচ্ছে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, লাগাতার খরা আর তাপপ্রবাহের কারণে ইউরোপের ভূগর্ভস্থ জল আর নদীর জল দ্রুত কমছে। যেসব জিনিস শতাব্দীর পর শতাব্দী জলের নিচে সুরক্ষিত ছিল, জল সরে যেতেই সেগুলো অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে নষ্টও হয়ে যাচ্ছে। তাই প্রত্নতত্ত্ববিদরা এখন দৌড়ে বেড়াচ্ছেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই জিনিসগুলো উদ্ধার করে সংরক্ষণ করার জন্য।
প্রকৃতির এই খরা যেমন একটা বিপদ, তেমনই এটা আমাদের জন্য সময়ের একটা জানালা খুলে দিয়েছে। নদীর বুকে লুকিয়ে থাকা ম্যামথের কঙ্কাল থেকে শুরু করে যুদ্ধজাহাজ - সবই যেন আমাদের অতীতের গল্প শোনাচ্ছে।
কিন্তু এই ইতিহাস দেখার আনন্দের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের এই ভয়াবহ রূপটাও আমাদের মনে রাখতে হবে।


