মা-ঠাকুমা বলতেন চাল যত ধোয়া যায় তত ভালো। আপনিও কি ভাত রান্নার আগে ৫-৬ বার চাল ধুয়ে জল একদম স্বচ্ছ করে ফেলেন? পুষ্টিবিদরা বলছেন আপনি রোজ নিজের অজান্তে চালের সবচেয়ে দামি পুষ্টিগুণটাই জলে ফেলে দিচ্ছেন।

Food Tips: ভাত ছাড়া বাঙালির দিন চলে না। কিন্তু এই রোজকার ভাত রান্নার প্রথম ধাপেই আমরা এমন একটা ভুল করি, যাতে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ দুটোরই ক্ষতি হয়। আমরা অনেকেই চালের জল একদম কাচের মতো স্বচ্ছ না হওয়া পর্যন্ত ধুতে থাকি। মনে করি, এটাই পরিষ্কারের নিয়ম। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে উল্টো কথা।

আসলে চাল কেন ধোয়া হয়?

মাঠ থেকে চাল যখন আমাদের হাঁড়ি পর্যন্ত আসে, তখন তার গায়ে অনেক কিছুই লেগে থাকে।

- মাঠের ধুলোবালি ও ছোট পাথরকুচি

- কীটনাশকের অবশেষ

- মিলে চাল পালিশ করার সময় ব্যবহার করা ট্যালক বা গ্লুকোজ পাউডার

- সংরক্ষণের জন্য দেওয়া পাউডার

এগুলো পরিষ্কার করার জন্যই চাল ধোয়া জরুরি। কিন্তু এর মানে এই নয় যে ঘণ্টা ধরে ধুতে হবে।

পুষ্টিবিদরা বলছেন - ২ থেকে ৩ বারই যথেষ্ট!

FSSAI এবং পুষ্টিবিদদের মতে, চাল ধোয়ার সঠিক নিয়ম হলো:

১. প্রথম ধোয়া - আসল পরিষ্কার: একটি বড় পাত্রে চাল নিয়ে বেশি জল দিন। হাত দিয়ে ১০-১৫ সেকেন্ড আলতো করে কচলে নিন, ডলবেন না। দেখবেন জলটা দুধের মতো ঘোলা হয়ে গেছে। এই প্রথম জলেই ৮০-৯০% ময়লা, ধুলো ও রাসায়নিক বেরিয়ে যায়। এই জলটা ফেলে দিন।

২. দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধোয়া - ফাইনাল রিন্স: আবার জল দিয়ে হালকা করে ধুয়ে নিন। দ্বিতীয়বার জলটা অনেকটা পরিষ্কার থাকবে। তৃতীয়বার জল প্রায় ৮০% স্বচ্ছ দেখাবে। ব্যাস, এখানেই থামুন। আর ধোয়ার কোনও দরকার নেই। জল ১০০% স্বচ্ছ করার চেষ্টা করবেন না।

ভুল করে ৫-৬ বার ধুলে কী মারাত্মক ক্ষতি হয়?

১. সবচেয়ে দামি পুষ্টিটাই নষ্ট হয়ে যায়:

আপনি কি রেশন বা সরকারি ফর্টিফায়েড চাল খান? তাহলে এই ভুলটা আরও মারাত্মক। সরকার এই চালে বাড়তি আয়রন, ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন B12 মেশায় যাতে অপুষ্টি দূর হয়। এই পুষ্টিগুলো চালের গায়ে পাউডার হিসেবে লাগানো থাকে। আপনি ৫-৬ বার ধুলে সেই পাউডারটাই পুরো ধুয়ে ফেলে দিচ্ছেন। FSSAI নিজেই বলছে, ফর্টিফায়েড চাল কখনও বেশি ধোয়া উচিত নয়, হালকা করে ১ বার ধুলেই যথেষ্ট। এমনকি সাধারণ সাদা চালেও B-ভিটামিন থাকে, যা বেশি ধুলে নষ্ট হয়।

২. জলের বিশাল অপচয়:

একবার ভেবে দেখুন, আপনি যদি রোজ ভাত রান্নার জন্য ৩ লিটার জল বেশি খরচ করেন, মাসে ৯০ লিটার, বছরে প্রায় ১১০০ লিটার জল শুধু শুধু নষ্ট হচ্ছে। কলকাতার মতো শহরে যেখানে জলের সমস্যা বাড়ছে, সেখানে এই অপচয় অনেক বড় ব্যাপার।

৩. ভাতের স্বাদ ও গঠন নষ্ট:

চালের গায়ে প্রাকৃতিক স্টার্চ থাকে, যা ভাতকে ঝরঝরে ও সুস্বাদু করে। অতিরিক্ত ধুলে সেই স্টার্চ বেরিয়ে যায়। ফলে ভাত হয় আঠালো বা একেবারে ভেঙে যায়।

তাহলে কখন একটু বেশি ধুতে হবে?

- যদি চাল বস্তা থেকে সরাসরি কেনা হয় এবং তাতে পাথর বা ধুলো বেশি থাকে - ৩ থেকে ৪ বার।

- যদি লাল চাল বা ব্রাউন রাইস হয়, যাতে তুষ বেশি থাকে - ৩ বার।

- কিন্তু প্যাকেটের বাসমতী, ফর্টিফায়েড বা ভালো কোম্পানির মিনিকেট চাল হলে ২ বারই যথেষ্ট।

চাল ধোয়া জল ফেলবেন না, এই ৩ কাজে লাগান:

এই জলকে গ্রামের দিকে 'আমানি' বলা হয়, এর অনেক গুণ।

১. গাছের জন্য সেরা সার: ঠান্ডা করে গাছের গোড়ায় দিন, গাছ তরতর করে বাড়বে।

২. ত্বক ও চুলের জন্য: এই জল দিয়ে মুখ ধুলে ত্বক উজ্জ্বল হয়। চুলে শেষবার ধুলে চুল সিল্কি হয়। কোরিয়ানরা এই টোটকা বহু বছর ধরে ব্যবহার করে।

৩. ডাল ধোয়া বা আটা মাখায়: এই জল দিয়ে ডাল ধুতে পারেন বা আটা মাখতে পারেন, পুষ্টি নষ্ট হবে না।

মনে রাখবেন, পরিষ্কার করা জরুরি, কিন্তু অতিরিক্ত পরিষ্কার করতে গিয়ে পুষ্টি ধুয়ে ফেলা বোকামি। আজ থেকে ২-৩ বারের বেশি নয়।

আরও খবরের জন্য চোখ রাখুন এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।