Floriography: পুজো, বিয়ে, মালা সবখানেই গাঁদা ফুল। কিন্তু জন্মদিন বা ভালোবাসার উপহারের তোড়ায় কখনও গাঁদা দেখেছেন? এর পেছনে রয়েছে ধর্ম, গন্ধ ও আন্তর্জাতিক ফুলের ভাষার এক অজানা ইতিহাস।
Floriography: ভাবুন তো, সরস্বতী পুজো থেকে দুর্গাপুজো, বিয়ের মণ্ডপ থেকে গৃহপ্রবেশ, নেতার গলার মালা থেকে ঘরের দরজার তোরণ - গাঁদা ফুল ছাড়া বাঙালির কোনও উৎসব ভাবা যায়? বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ফুলও এই গাঁদা। কিন্তু আপনার প্রেমিকাকে বা বন্ধুর জন্মদিনে কখনও গাঁদা ফুলের তোড়া উপহার দিয়েছেন? দেননি। ফুলের দোকানেও কেউ গাঁদা দিয়ে তোড়া বানায় না। কেন এই বৈষম্য?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ইতিহাস, ধর্ম ও ব্যবসার অঙ্কে।
*১. ফুলের ভাষা বা Floriography - গাঁদা মানেই দুঃখ:*
উপহারের তোড়া বা Bouquet-এর ধারণাটাই এসেছে ইউরোপ থেকে। ভিক্টোরিয়ান যুগে প্রতিটি ফুলের একটি গোপন অর্থ ছিল, যাকে বলা হত Floriography। গোলাপ মানে ভালোবাসা, লিলি মানে শুদ্ধতা, অর্কিড মানে বিলাসিতা, লাল টিউলিপ মানে প্রেমের স্বীকারোক্তি। আর গাঁদা ফুলের অর্থ ছিল *'ঈর্ষা, শোক, দুঃখ ও মৃত্যু'*।
পশ্চিমা দেশে গাঁদাকে বলা হয় 'Flower of Grief'। মেক্সিকোতে 'Day of the Dead' বা মৃতদের উৎসবে গাঁদা ব্যবহার করা হয় মৃত আত্মাকে স্বাগত জানাতে। ইউরোপে কবরের ওপর গাঁদা দেওয়া হয়। তাই ভালোবাসা, জন্মদিন বা Anniversary-র মতো আনন্দের দিনে কেউ দুঃখ ও মৃত্যুর প্রতীক দিতে চায় না। এই ধারণাটাই গোটা বিশ্বের ফ্লোরিস্টরা মেনে চলেন।
*২. ধর্মীয় ট্যাগ - পুজোর ফুল বনাম প্রেমের ফুল:*
ভারতে গাঁদা হল অত্যন্ত পবিত্র ও সাত্ত্বিক ফুল। এটি দেবতার পায়ে দেওয়া হয়, মালা গাঁথা হয়। তাই বাঙালির মনে এটি 'পুজোর ফুল' হিসেবেই গেঁথে গেছে।
উপহারের তোড়া হল অনেক বেশি আধুনিক, রোমান্টিক ও ব্যক্তিগত একটি বিষয়। সেখানে পুজোর ফুল দিলে সেটা 'সস্তা' বা 'অনুষ্ঠানের প্রসাদ' মনে হয়। যেমন আপনি কাউকে বেলপাতা, জবা বা ধুতরা ফুলের তোড়া দেবেন না, কারণ সেগুলো পুজোর উপকরণ। গাঁদার ক্ষেত্রেও একই মানসিকতা কাজ করে। প্রেমিকার হাতে গাঁদার মালা দিলে সেটা প্রেম নিবেদন কম, সরস্বতী পুজোর অঞ্জলি বেশি মনে হবে।
*৩. গন্ধ, স্থায়িত্ব ও প্রিমিয়াম লুকের অভাব:*
এটা একটা বড় ব্যবসায়িক কারণ।
*ক) গন্ধ:* গাঁদা ফুলের গন্ধ অনেকের কাছে খুব উগ্র ও ঝাঁঝালো লাগে, যা বদ্ধ ঘরে, AC গাড়িতে বা হাসপাতালে মাথা ধরা তৈরি করে। গোলাপ বা লিলির মতো মিষ্টি গন্ধ নয়।
*খ) স্থায়িত্ব:* গাঁদা খুব তাড়াতাড়ি ঝরে যায়, পাপড়ি খুলে যায়, পচে যায়। গোলাপ, জারবেরা, লিলি, অর্কিড ফ্রিজে রাখলে ৪-৫ দিন ফ্রেশ থাকে, কিন্তু গাঁদা একদিনেই নেতিয়ে পড়ে। ফলে ফুল ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি নিতে চান না।
*গ) লুক:* তোড়ার সৌন্দর্যের জন্য যে প্যাস্টেল রঙ, লেয়ার, বিদেশি লুক দরকার, গাঁদার কটকটে হলুদ-কমলা রঙে সেই প্রিমিয়াম, ক্লাসি ভাবটা আসে না। এটিকে 'গ্রামের ফুল' বা 'সস্তা ফুল' ভাবা হয়। ২০ টাকায় এক মালা গাঁদা পাওয়া যায়, কিন্তু ২০০ টাকায় একটা গোলাপ। তাই দামি উপহারে গাঁদা ব্যবহার করলে ক্রেতা অপমানিত বোধ করেন।
*তাহলে কি গাঁদা চিরকাল ব্রাত্য থাকবে?*
না, এখন সময় বদলাচ্ছে। অনেক আধুনিক ফ্লোরিস্ট এখন গাঁদাকে 'Desi Chic' বা 'Boho Look' হিসেবে ব্যবহার করছেন। বিয়ের মেহেন্দি বা হলদিতে গাঁদা, গোলাপ ও রজনীগন্ধা মিশিয়ে সুন্দর তোড়া বানানো হচ্ছে। বিদেশেও এখন ভারতীয় বিয়ের থিমে গাঁদা খুব ট্রেন্ডি।
হয়তো আর কয়েক বছর পর আপনার ভালোবাসার মানুষের হাতে গাঁদার তোড়াও দেখা যাবে, তবে তার অর্থ হবে - "তোমার মতো উজ্জ্বল আর কেউ নয়"।
আরও খবরের আপডেট পেতে চোখ রাখুন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।


