মেঘের রাজ্য, শাল-সেগুন-মহুয়া বনের সবুজ গালিচা আর পাহাড়ি ঝর্ণার অবিরাম কলতান— বর্ষায় ছোটনাগপুর মালভূমির রানি নেতারহাট যেন এক প্রাণোচ্ছল বালিকা। ঝাড়খণ্ডের লাতেহার জেলায় প্রায় ৩,৬২২ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই হিল স্টেশনটি বর্ষাকালে প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য স্বর্গরাজ্য।
মেঘের রাজ্য, শাল-সেগুন-মহুয়া বনের সবুজ গালিচা আর পাহাড়ি ঝর্ণার অবিরাম কলতান— বর্ষায় ছোটনাগপুর মালভূমির রানি নেতারহাট (Netarhat) যেন এক প্রাণোচ্ছল বালিকা। ঝাড়খন্ডের লাতেহার জেলায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৬২২ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই হিল স্টেশনটিকে ব্রিটিশরা বলতেন 'নেচার্স হার্ট', সেখান থেকেই নাকি নেতারহাট নাম। বর্ষা এলেই এই মালভূমির রূপ বদলে যায়। শুকনো লাল মাটি ঢেকে যায় সবুজ কার্পেটে। শাল-সেগুন-মহুয়া বনে নতুন পাতা গজায়, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে জন্ম নেয় ছোট ছোট ঝর্ণা। শহরের গরম, ধোঁয়া আর কোলাহল থেকে পালাতে বর্ষার দিনে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে দিন চারেকের ছুটিতে ঘুরে আসতেই পারেন এই মেঘের দেশ থেকে।
কেন বর্ষায় নেতারহাট যাবেন?
বর্ষায় নেতারহাটের রূপই আলাদা। অন্য সময় নেতারহাট শুকনো, রুক্ষ থাকে। কিন্তু বর্ষায় সে যেন সদ্য স্নান করা কিশোরী। চারদিকে ঘন সবুজ শালের জঙ্গল, মেঘ এসে ঢুকে পড়ে হোটেলের বারান্দায়। সকালে ঘুম ভাঙে মেঘের চাদরে মুড়ে। রাস্তায় যেতে যেতে হঠাৎ মেঘ এসে সব ঢেকে দেবে, দু'হাত দূরের জিনিসও দেখা যাবে না। এই মেঘ-রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলাই এখানকার প্রধান আকর্ষণ।
- প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য স্বর্গ: ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি ও মেডিটেশনের জন্য আদর্শ।
- ভিড় কম: দার্জিলিং বা পুরুলিয়ার মতো ভিড় নেই, নিরিবিলিতে প্রকৃতি উপভোগ করা যায়।
কী কী দেখবেন? ৫টি মাস্ট ভিজিট স্পট:
১. ম্যাগনোলিয়া সানসেট পয়েন্ট: নেতারহাটের সবচেয়ে বিখ্যাত পয়েন্ট। কথিত আছে, এক ব্রিটিশ সাহেবের মেয়ে ম্যাগনোলিয়া এক রাখালের প্রেমে পড়েছিলেন, কিন্তু বাবা মেনে নেননি। দুঃখে ঘোড়া নিয়ে এই খাদে ঝাঁপ দেন তিনি। এখান থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্য অবর্ণনীয়। বর্ষায় মেঘের ফাঁকে সূর্যাস্ত দেখা ভাগ্যের ব্যাপার। আকাশে তখন লাল-কমলা রঙের খেলা চলে।
- টিপস: বিকেল ৪টের মধ্যে পৌঁছে যান, ভালো জায়গা পাবেন।
২. আপার ঘাগরি ও লোয়ার ঘাগরি জলপ্রপাত: বর্ষায় এই দুই জলপ্রপাত জলে টইটম্বুর হয়ে ওঠে। আপার ঘাগরি ৩০ ফুট উঁচু থেকে পড়ে। লোয়ার ঘাগরি যেতে প্রায় ১০ কিমি ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ট্রেক করে যেতে হয়। ঝর্ণার শব্দ শুনলেই মন ভালো হয়ে যাবে।
- টিপস: লোয়ার ঘাগরিতে যেতে লোকাল গাইড নিন, রাস্তা পিচ্ছিল থাকে।
৩. কোয়েল ভিউ পয়েন্ট: এখান থেকে নিচে প্রায় ১০০০ ফুট গভীরে কোয়েল নদীর বয়ে যাওয়া দেখা যায়। বর্ষায় নদী ভরা থাকে, আর নদীর ওপারে ঘন জঙ্গল দেখে মনে হয় ক্যানভাসে আঁকা ছবি। এটি নেতারহাটের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ভিউ পয়েন্ট।
৪. নেতারহাট আবাসিক স্কুল ও পাইন ফরেস্ট: ১৯৫৪ সালে তৈরি বিখ্যাত আবাসিক স্কুলটি ব্রিটিশ স্থাপত্যের নিদর্শন। এর পাশেই আছে পাইন ফরেস্ট। সারি সারি পাইন গাছের মধ্যে মেঘ জমে থাকে, মনে হবে আপনি সিমলা বা মানালিতে আছেন।
৫. লোধ জলপ্রপাত: নেতারহাট থেকে প্রায় ৬০ কিমি দূরে, ঝাড়খণ্ডের উচ্চতম জলপ্রপাত (৪৭০ ফুট)। বর্ষায় এর গর্জন বহু দূর থেকে শোনা যায়। নেতারহাট এলে এটা মিস করবেন না।
কীভাবে যাবেন?
কলকাতা থেকে নেতারহাট প্রায় ৫৬০ কিমি।
- ট্রেনে: হাওড়া থেকে রাঁচি যান (ক্রিয়াযোগা এক্সপ্রেস / শতাব্দী / হাতিয়া এক্সপ্রেস)। রাঁচি থেকে নেতারহাট ১৫৬ কিমি, গাড়িতে ৪-৫ ঘণ্টা। রাঁচি থেকে শেয়ার গাড়ি ও সরকারি বাসও পাবেন।
- গাড়িতে: কলকাতা-জামশেদপুর-রাঁচি-লোহারদাগা-নেতারহাট রুট ধরে সরাসরি যেতে পারেন। রাস্তা খুব ভালো।
থাকা-খাওয়া ও বেস্ট টাইম:
থাকার জন্য অনেক ছোটখাটো বড় হোমস্টে পেয়ে যাবেন।বেস্ট টাইম জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর। ছাতা, রেইনকোট, ভালো গ্রিপের জুতো, টর্চ, ওডোমস, জোঁক থেকে বাঁচতে লবণ সঙ্গে রাখুন।
