সবে দুপুরের খাবার খেলেন, আধ ঘণ্টাও হয়নি, মাথায় আবার ঘুরছে— রাতে কী খাবেন? বিকেলে কী স্ন্যাকস খাওয়া যায়? ডায়েটে আছেন, তবুও মগজ জুড়ে শুধু বিরিয়ানি, ফুচকা, মিষ্টির ছবি? এই অদ্ভুত অবস্থার নাম ‘ফুড নয়েজ'।

আপনি কি কখনও খেয়াল করেছেন, পেট ভরা থাকলেও মাথা ভরা থাকে না? পেট বলছে "আর খাব না", কিন্তু মস্তিষ্ক বলছে "আর একটু খাই, আর একটা চিপস খাই"।

সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই খাবারের রিল, অফিসে বসের বকা শুনলেই মন চাইছে মিষ্টি, মন খারাপ হলেই মনে হচ্ছে বিরিয়ানি খেলে ঠিক হয়ে যাবে— এই যে সারাক্ষণ মাথার ভেতর খাবারের হাঁকডাক, এরই নাম Food Noise।

ফুড নয়েজ আসলে কী?

ফুড নয়েজ কোনও রোগ নয়, এটি একটি মানসিক অবস্থা। আমেরিকার মনোবিদরা প্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন।

সহজ ভাষায়, ফুড নয়েজ হলো খাবার নিয়ে অতিরিক্ত এবং অনবরত চিন্তা। এটা শরীরের খিদে নয়, মাথার খিদে। আপনার শরীরের ক্যালোরি লাগবে না, তবুও মস্তিষ্ক আপনাকে বারবার খাবারের কথা মনে করিয়ে দেয়। যেন মাথার ভেতর কেউ লাউডস্পিকারে বলছে— "খা, খা"।

ডায়েটিশিয়ানরা বলছেন, ওজন কমানোর ওষুধ Ozempic বা Mounjaro নেওয়ার পর মানুষের এই ফুড নয়েজ হঠাৎ কমে যায় বলেই তাদের খিদে কমে যায়। অর্থাৎ, এর যোগ সরাসরি মস্তিষ্কের সঙ্গে।

আপনি ফুড নয়েজ-এর শিকার কিনা কীভাবে বুঝবেন? ৫টি লক্ষণ—

১. খাওয়ার পরেও খাবারের চিন্তা: এইমাত্র ভাত খেয়ে উঠলেন, ২০ মিনিট পরেই ভাবছেন, "একটু কিছু মিষ্টি খেলে ভালো হতো"।

২. অপরাধবোধ ও খাবারের লড়াই: সারাক্ষণ ভাবছেন, "এটা খাওয়া উচিত নয়, ওটা খেলে মোটা হয়ে যাব", আবার পরমুহূর্তেই ভাবছেন, "থাক, আজ খেয়ে নিই, কাল থেকে ডায়েট"।

৩. বিরক্তি বা আবেগ থেকে খাওয়া: খিদে না পেলেও মন খারাপ, রাগ বা একঘেয়েমি কাটাতে ফ্রিজ খুলছেন।

৪. সোশ্যাল মিডিয়া ট্রিগার: ইনস্টাগ্রামে খাবারের ছবি দেখলেই অস্থির লাগা, Swiggy-Zomato অ্যাপ বারবার খুলে দেখা, যদিও খিদে নেই।

৫. খাবার নিয়ে প্ল্যানিংয়ের নেশা: সারাক্ষণ পরের বেলার খাবার নিয়ে প্ল্যান করা— কাল সকালে কী খাব, পরশু বন্ধুদের সঙ্গে কোথায় খাব।

কেন হয় এই ফুড নয়েজ?

- কঠোর ডায়েটিং: যত বেশি নিজেকে "এটা খাব না" বলবেন, মস্তিষ্ক তত বেশি সেটা নিয়েই ভাববে। - ঘুম কম হওয়া: ঘুম কম হলে হরমোন ঘেটে যায়, মস্তিষ্কে ফুড নয়েজ় বাড়ে। - স্ট্রেস ও কর্টিসল: স্ট্রেস হরমোন বাড়লে মস্তিষ্ক কার্ব ও মিষ্টি খুঁজতে থাকে আরামের জন্য। - অতিরিক্ত প্রসেসড ফুড: চিপস, কোল্ড ড্রিংকস, ফাস্ট ফুড মস্তিষ্কে ডোপামিন বাড়িয়ে ফুড নয়েজ় তৈরি করে।

মুক্তি পাবেন কীভাবে?

১. খাবারকে শত্রু ভাববেন না: "আমি বিরিয়ানি খাব না" না বলে বলুন, "আমি আজ অল্প বিরিয়ানি খাব, সঙ্গে অনেক সালাদ"। নিষিদ্ধ করলেই আকর্ষণ বাড়ে।

২. প্রোটিন ও ফাইবার বাড়ান: সকালে ২টো বিস্কুট না খেয়ে ডিম, ছোলা, ওটস খান। পেট অনেকক্ষণ ভরা থাকলে মাথায় নয়েজ় কমবে।

৩. মাইন্ডফুল ইটিং: মোবাইল না দেখে, চিবিয়ে, স্বাদ নিয়ে খান। মস্তিষ্ককে সময় দিন বুঝতে যে আপনি খাচ্ছেন।

৪. ঘুম ও জল: দিনে ৭ ঘণ্টা ঘুম ও ৩ লিটার জল ফুড নয়েজ ৫০% কমিয়ে দেয়।

৫. ১০ মিনিটের নিয়ম: খাবারের তীব্র ইচ্ছে হলে ঘড়ি দেখুন। ১০ মিনিট অন্য কাজে ব্যস্ত থাকুন— হাঁটুন, গান শুনুন। ৮০% সময় দেখবেন ইচ্ছেটা চলে গেছে।

মনে রাখবেন, মাঝে মাঝে খাবারের কথা ভাবা স্বাভাবিক। কিন্তু যদি সারাক্ষণ মগজ জুড়ে শুধু খাবারের হাঁকডাক চলে এবং তার জন্য আপনার কাজ, ঘুম, ডায়েট নষ্ট হয়, তাহলে এটি ফুড নয়েজ। তখন একজন ডায়েটিশিয়ান বা সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।