বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সই হওয়া ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক বাতিল করছে না। বরং দু'দেশের স্বার্থ রক্ষায় চুক্তিগুলোর অসঙ্গতি দূর করে সেগুলোকে 'উইন-উইন' বা লাভজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।

বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সই হওয়া ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (MoU) খতিয়ে দেখছে। তবে এগুলো বাতিলের কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং চুক্তিগুলোতে কোনো অসঙ্গতি থাকলে তা দূর করে দু'দেশের জন্যই লাভজনক বা 'উইন-উইন' পরিস্থিতি তৈরি করাই এই পর্যালোচনার মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এই কথা জানিয়েছেন।

ভারতের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে বড় কথা বাংলাদেশের

নুরুল ইসলাম মনি শুক্রবার গভীর রাতে ফোনে এএনআই-কে জানান, বিভিন্ন সময়ে ভারতের সঙ্গে হওয়া চুক্তিগুলো বাতিলের কোনো ভাবনা তাদের নেই। তবে পর্যালোচনার পর যদি দেখা যায় কোনো শর্ত বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী, তবে তা বাদ দেওয়া হবে। তিনি বলেন, "আমরা ভারতের সঙ্গে হওয়া চুক্তিগুলোতে কোনো অসঙ্গতি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখব। যদি তেমন কিছু পাওয়া যায়, তবে আমরা তা সমাধানের চেষ্টা করব।" তিনি আরও জানান, "বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো বর্তমান চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে দেখবে। কেবল অসঙ্গতি ধরা পড়লেই তা নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।"

নুরুল ইসলাম মনি গত সপ্তাহেই জানিয়েছিলেন, বর্তমান সরকার আগের আওয়ামী লিগ সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে সই হওয়া ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করছে। খুব শিগগিরই এর ফলাফল জানানো হবে। তাঁর কথায়, "আমরা ১০১টি সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি খতিয়ে দেখছি, আর খুব তাড়াতাড়ি আপনারা এর ফলাফল জানতে পারবেন।"

বাংলাদেশ এখন জাতীয় স্বার্থের কথা মাথায় রেখে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ, পরিকাঠামো এবং অন্যান্য সহযোগিতামূলক দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলো খতিয়ে দেখছে। আর ঠিক সেই আবহেই এই পর্যালোচনার খবর সামনে এল।

ভারতের অবস্থান

নয়াদিল্লি পুরো বিষয়টির ওপর নজর রাখলেও জানিয়েছে, ঢাকা থেকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কিছু জানানো হয়নি। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শুক্রবার এক সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, "আমরাও সংবাদমাধ্যমে এই সংক্রান্ত কিছু খবর দেখেছি। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। এটা স্পষ্ট যে, নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ভারত সব রকম প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।"

ভারত- বাংলাদেশ চুক্তি

ভারত-বাংলাদেশ চুক্তির অন্যতম বড় দিক হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করার বিষয়টি। বর্তমান পর্যালোচনায় এই চুক্তির শর্তগুলোও খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে।

জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতাও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। বাংলাদেশ মূলত আমদানি করা বিদ্যুৎ এবং আন্তঃসীমান্ত জ্বালানি চুক্তির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির কারণে কিছু বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির দাম মেটাতে দেরি হচ্ছে। পাশাপাশি আর্থিক শর্তগুলো নতুন করে বিবেচনার অনুরোধও জানানো হয়েছে।

ভারত এছাড়া বাংলাদেশে রেল, সড়ক ও বন্দর প্রকল্পের জন্য একাধিক 'লাইন অফ ক্রেডিট'-এর মাধ্যমে ৭০০ কোটি ডলারেরও বেশি ঋণ দিয়েছে।

বাংলাদেশের পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষ ভারতের অর্থায়নে চলা বেশ কয়েকটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। এই পর্যালোচনার ফলে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন এবং তহবিল ব্যবহারের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

সীমান্ত নিরাপত্তা সহযোগিতাও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ তাদের মাটি ব্যবহার করে ভারত-বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কার্যকলাপ রুখতে নয়াদিল্লিকে সাহায্য করেছিল। এছাড়া সীমান্ত সহযোগিতার মধ্যে আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান, বেআইনি অনুপ্রবেশ এবং জঙ্গি কার্যকলাপ রোখার মতো বিষয়গুলোও রয়েছে।

বাংলাদেশ অবশ্য স্পষ্ট জানিয়েছে যে, এই পর্যালোচনার অর্থ কোনোভাবেই বর্তমান চুক্তিগুলো পুরোপুরি বাতিল করা নয়। বরং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো প্রতিটি চুক্তি আলাদাভাবে খতিয়ে দেখবে। আর যেখানে অসঙ্গতি পাওয়া যাবে, কেবল সেখানেই ভারতের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।