সময়টা যদি বর্ষাকাল হয় তবে তো কথাই নেই। 'মাছের রাজা' এই সময় এন্ট্রি নেন বাঙালির হেঁশেলে। সারাদিন ঝিরঝিরে বৃষ্টি। একটু ঠান্ডা ঠান্ডা আমেজ, তার সঙ্গে জমিয়ে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা। আর শুধু ভাজা কেন, সর্ষে, ভাপা, বেগুন দিয়ে পাতলা ঝোল... এই স্বাদের কোনও তুলনাই নেই।
রবীন্দ্রনাথ ছোটবেলায় যে ছড়া লিখেছিলেন তাতে তাঁর রসবোধ এবং খাদ্যরসিকতার চূড়ান্ত নিদর্শন মেলে।
"আমসত্ত্ব দুধে ফেলি, তাহাতে কদলী দলি, সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে।
হাপুস হুপুস শব্দ, চারিদিক নিস্তব্ধ, পিঁপড়া কান্দিয়া যায় পাতে।।"
মানে যে জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি নেহাত খেলার ছলে যে ছড়া রচনা করেছিলেন, তাতেও খাবার ছিল প্রধান বিষয়। তাহলেই বুঝুন সে জাতির খাবারের প্রতি বিশেষত ভালো খাবারের প্রতি কতটা দুর্বল হতে পারে। আর সময়টা যদি বর্ষাকাল হয় তবে তো কথাই নেই। 'মাছের রাজা' এই সময় এন্ট্রি নেন বাঙালির হেঁশেলে। সারাদিন ঝিরঝিরে বৃষ্টি। একটু ঠান্ডা ঠান্ডা আমেজ, তার সঙ্গে জমিয়ে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা। আর শুধু ভাজা কেন, সর্ষে, ভাপা, বেগুন দিয়ে পাতলা ঝোল... এই স্বাদের কোনও তুলনাই নেই।

বৃষ্টির কি স্বাদ আছে?
আজ এমনই এক বর্ষা মুখর দিনে বাঙালির রসনা আর ভোজনবিলাশ নিয়ে 'জিয়া নস্ট্যাল' করতে একই মঞ্চে একত্রিত হয়েছিলেন বিখ্যাত শেফ শন কেন ওয়র্দি, 'আমার খামার'-এর সহ প্রতিষ্ঠাতা সুজয় চট্টোপাধ্যায়, যিনি একাধারে সাসটেনেবল কৃষি, বিরল ও প্রাচীন চাল, মসুর ডাল, ঘি এবং মধুর ঐতিহ্যগত সংগ্রহের কাজ করেন। আর এঁদের একসূত্রে বেঁধেছিলেন কলকাতা লিটারেরি মিট এবং গেমপ্ল্যান-এর ডিরেক্টর মালবিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রাইমার্ক পোডিয়ামের তরফ থেকে এই বিশেষ সংস্করণের আয়োজন করা হয়েছিল। আলোচনার শিরোনাম ছিল ‘ডু দ্য রেইনস হ্যাভ আ টেস্ট?’
সত্যিই তো! কখনও ভেবে দেখেছেন, বৃষ্টির কি স্বাদ আছে? আর কারও কাছে না থাক, বাঙালির কাছে অবশ্যই আছে। আর শুধু স্বাদ কেন, গন্ধ-আমেজ দুই-ই আছে। আলোচনায় সে কথাই বার বার উঠে এসেছে। শন যেমন ইংল্যান্ডের প্রচণ্ড ঠান্ডা স্যাঁতস্যাঁতে বর্ষায় প্রায়ান্ধকার বর্ষার মধ্যে কীভাবে ছোটবেলা কাটিয়েছেন এবং তাঁদের খাদ্যাভ্যাস কেমন ছিল তা নিয়ে বলেন। তেমনই সুজয় তুলে ধরেন বাংলায় লেখা বিভিন্ন লেখকের নানা বইয়ে থাকা উদাহরণ। ফরাক্কা বাঁধ হওয়ার আগে কানপুরেও যে ইলিশ ধরা পড়ত, তা এর আগে জানা ছিল না অনেকের। একই সঙ্গে বাঙালির পাতে যে সমস্ত মাছ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে আক্ষেপও শোনা যায় সুজয়ের গলায়।

'নানা হাসি রাশি রাশি...'
এই আয়োজনে হাসির খোরাক জুগিয়েছেন জনপ্রিয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর শুভম চৌধুরী, যিনি 'বং শর্ট' নামে বেশি পরিচিত। তাঁর নিজস্ব স্বভাবসিদ্ধ রন্ধনসম্পর্কীয় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি খাবারের প্রতি বাঙালির চিরন্তন ভালোবাসা এবং বাঙালি ডাইনিং টেবিলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নানা আবেগ, আচার ও কথোপকথন তুলে ধরেন। এই আলোচনার পর ছিল '৬ বালিগঞ্জ প্লেস'-এর তৈরি একটি বিশেষভাবে কিউরেট করা মনসুন লাঞ্চ। এটি অতিথিদের একটি অন্তরঙ্গ এবং আকর্ষণীয় পরিবেশে এই ঋতুর স্বাদ উপভোগ করার সুযোগ করে দেয়। আড্ডা, রান্না এবং রসবোধের এই সংমিশ্রণ এমন একটি দুপুর তৈরি করেছিল যা কলকাতার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিককে এক সূত্রে বেঁধে ফেলে।


