অফিসের ল্যাপটপ বন্ধ হলেও মাথায় ঘোরে মিটিং, ডেডলাইন। সন্তান পাশে বসে গল্প করতে চাইলেও আপনি ফোনে ব্যস্ত। এই অদৃশ্য দেওয়ালই একদিন অনেক বড় হয়ে যায়। চাকরির চাপ কীভাবে সম্পর্ক নষ্ট করছে, জানুন।

আজকাল বেশিরভাগ বাবা-মা দুজনেই চাকরিজীবী। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা অফিস, তারপর বাড়ি ফিরে আবার ল্যাপটপ, ফোন। শারীরিকভাবে আপনি বাড়িতে থাকলেও মানসিকভাবে আপনি অফিসেই। আর এই সময়টাতেই আপনার সন্তান একটু একটু করে আপনার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য দেওয়াল।

মনোবিদরা বলছেন, এর নাম 'Present but Absent Parenting'। আপনি আছেন, কিন্তু নেই। সন্তান স্কুলের গল্প বলতে এলে আপনি বলেন, "পরে শুনব, এখন একটা মেইল করছি।" ও ছবি আঁকলে আপনি না দেখেই বলেন, "খুব সুন্দর হয়েছে।" বাচ্চারা কিন্তু সব বোঝে। প্রথমে তারা জেদ করে, রাগ দেখায় আপনার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। যখন দেখে তাতেও কাজ হচ্ছে না, তখন তারা নিজেদের গুটিয়ে নেয়। নিজের জগৎ তৈরি করে নেয় মোবাইল, গেম বা বন্ধুদের নিয়ে।

এই দেওয়ালের লক্ষণগুলো কী?

১. সন্তান আর আপনাকে কিছু বলতে আসে না, সব কথা মা বা বন্ধুকে বলে।

২. আপনার সঙ্গে থাকার চেয়ে একা ঘরে থাকতেই সে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করে।

৩. ছোটখাটো বিষয়ে অতিরিক্ত রেগে যাওয়া বা জেদ করা।

৪. পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া।

এই দূরত্ব একদিনে তৈরি হয় না, রোজ একটু একটু করে তৈরি হয়। আর একবার দেওয়ালটা শক্ত হয়ে গেলে ভাঙা খুব কঠিন, বিশেষ করে টিনএজ বয়সে।

দেওয়াল ভাঙবেন কীভাবে?

চাকরি ছাড়তে হবে না, শুধু কিছু অভ্যাস বদলাতে হবে।

১. ২০ মিনিটের গোল্ডেন রুল: বাড়ি ফিরে প্রথম ২০ মিনিট ফোন, ল্যাপটপ একদম বন্ধ। এই সময়টা শুধু সন্তানের। ও কী করল সারাদিন, শুনুন। কোনও উপদেশ নয়, শুধু শুনুন।

২. No Phone Zone: খাওয়ার টেবিল এবং শোবার ঘরকে নো ফোন জোন বানান। একসঙ্গে খেতে বসলে গল্প হয়, সম্পর্ক তৈরি হয়।

৩. কোয়ালিটি ওভার কোয়ান্টিটি: সারাদিন সময় দিতে না পারলেও, যতটুকু দেবেন মন দিয়ে দিন। সপ্তাহে একদিন, মাত্র ২ ঘণ্টা ওর পছন্দের কিছু করুন - পার্কে যাওয়া, সাইকেল চালানো বা ওর সঙ্গে বসে কার্টুন দেখা।

৪. অপরাধবোধ থেকে বেরিয়ে আসুন: কাজের জন্য সময় দিতে না পারার জন্য সারাক্ষণ গিল্টে ভুগবেন না এবং দামি খেলনা দিয়ে সেই অভাব পূরণ করার চেষ্টা করবেন না। বাচ্চার দামি খেলনা নয়, আপনার সময় চাই।

মনে রাখবেন, আপনার সন্তান একদিন বড় হয়ে যাবে। ততখন প্রমোশন, স্যালারি স্লিপ মনে থাকবে না, কিন্তু মনে থাকবে বাবা-মা তার গল্পটা শুনেছিল কি না। চাকরির চাপ থাকবেই, কিন্তু তার মাঝেই ওইটুকু সময় বের করে নিন, যাতে অদৃশ্য দেওয়ালটা আর উঁচু না হয়।