উইকএন্ডে দুদিনের ছুটি পেয়েছেন? দার্জিলিংয়ে ভিড়, কালিম্পংয়ে হোটেল ফুল, আর লাটাগুড়ি-গরুমারা তো সবাই যাচ্ছে। তাহলে এবার একটু অফরুটে যান। NJP স্টেশন বা বাগডোগরা এয়ারপোর্ট থেকে মাত্র দেড় ঘণ্টার ড্রাইভে পৌঁছে যান মানাবাড়ি। কালিম্পং জেলার গরুবাথান ব্লকের ছোট্ট এই পাহাড়ি গ্রাম এখনও ট্যুরিস্টের ভিড়ে হাঁপিয়ে ওঠেনি।
উত্তরবঙ্গ মানেই আমাদের মাথায় আসে দার্জিলিং, গ্যাংটক বা ডুয়ার্সের জঙ্গল। কিন্তু ভিড় এড়িয়ে যারা দুদিন পাহাড়ের কোলে চুপচাপ কাটাতে চান, তাদের জন্য নতুন নাম মানাবাড়ি। NJP থেকে দূরত্ব মাত্র ৪৫ কিলোমিটার। সেবক কালীবাড়ি পেরিয়ে সেবক করোনেশন ব্রিজের আগে ডানদিকে বাগরাকোট হয়ে ঢুকে গেলেই রাস্তা উঠতে শুরু করবে পাহাড়ে। আধঘণ্টার মধ্যেই আপনি পৌঁছে যাবেন মানাবাড়ি বাজারে। শিলিগুড়ি থেকে শেয়ার গাড়ি বা রিজার্ভ করেও আসা যায়, ভাড়া পড়বে ১৮০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে।

কী আছে মানাবাড়িতে? প্রথমত, নির্ভেজাল শান্তি। গ্রামের শেষ প্রান্তে নেওড়া নদী। বর্ষায় নদী ফুলে-ফেঁপে ওঠে, কিন্তু স্রোতের আওয়াজটা কানে মধু ঢালে। নদীর পাড়ে বসে থাকুন, পায়ের পাতা ভিজিয়ে নিন, বা ছোট ছোট বোল্ডার টপকে ওপারে চলে যান। দ্বিতীয়ত, চা বাগান। মানাবাড়ির আশেপাশে ছড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটা ছোট চা বাগান। ভোরবেলা কুয়াশা মাখা চা বাগানের ভিতর দিয়ে হাঁটলে মনে হবে স্বপ্ন দেখছেন। তৃতীয়ত, সেবক রেল প্রজেক্টের সাইট। ভারতের সবচেয়ে উঁচু রেল ব্রিজগুলোর একটা তৈরি হচ্ছে এখানেই। নদীর উপর দিয়ে বিশাল বিশাল পিলার উঠেছে, নিচে দাঁড়ালে গা শিউরে উঠবে। ছবি তোলার জন্য আইডিয়াল।
থাকবেন কোথায়? মানাবাড়িতে এখনও বড় হোটেল গড়ে ওঠেনি, আর সেটাই এর ইউএসপি। গোটা চার-পাঁচেক হোমস্টে আছে। সবকটাই নদীর কাছাকাছি। জনপ্রতি ১২০০ থেকে ১৬০০ টাকার মধ্যে থাকা-খাওয়া হয়ে যাবে। গরম ভাত, ডাল, ঝিরঝিরে আলুভাজা, দেশি মুরগির ঝোল আর রাতে বোনফায়ারের পাশে চিকেন বার্বিকিউ, হোমস্টের দিদিরা নিজের হাতে রেঁধে খাওয়াবে। রাতে লোডশেডিং হলে হ্যারিকেনের আলো আর ঝিঁঝিঁর ডাক, এই কম্বোটা শহরে পাবেন না।
কী করবেন দুদিনে? প্রথম দিন পৌঁছে রেস্ট নিন। বিকেলে নদীর ধারে হাঁটুন, চা বাগানে ছবি তুলুন। সন্ধ্যায় হোমস্টের বারান্দায় বসে মেঘ দেখুন। বর্ষায় এখানে মেঘ ঘরে ঢুকে আসে। পরদিন ভোরে উঠে পড়ুন। একটা গাড়ি নিয়ে ঘুরে আসুন ৭ কিমি দূরের লাভা মনাস্ট্রি বা ১২ কিমি দূরের চেল নদী। চাইলে একবেলার জন্য সামসিং-সুনতালেখোলাও ঘুরে আসতে পারেন, দূরত্ব ২০ কিমি। কিন্তু আমার মতে, মানাবাড়িতে এসে কোথাও না গিয়ে শুধু হোমস্টের ব্যালকনিতে বসে বই পড়ুন আর বৃষ্টি দেখুন, এটাই বেস্ট।
কখন যাবেন? বর্ষাকাল, মানে জুন থেকে সেপ্টেম্বর, মানাবাড়ির আসল রূপ দেখার সময়। চারিদিক সবুজ, নদীতে জল, মেঘ-কুয়াশার লুকোচুরি। তবে যারা বৃষ্টি পছন্দ করেন না, তারা অক্টোবর থেকে মার্চ আসুন। তখন আকাশ পরিষ্কার, কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখাও মিলতে পারে।
একটা সতর্কবার্তা, বর্ষায় রাস্তায় মাঝে মাঝে ছোটখাটো ধস নামে। তাই ড্রাইভারকে বলে রাখবেন লেটেস্ট রোড কন্ডিশন জেনে নিতে। সাথে টর্চ, ওডোমস, আর পাওয়ার ব্যাঙ্ক রাখবেন। এখানে জিও-এয়ারটেলের নেটওয়ার্ক মোটামুটি কাজ করে, কিন্তু বৃষ্টি হলে উধাও হয়ে যায়।
উইকএন্ডে পকেট ফ্রেন্ডলি আর ভিড়-ফ্রি ঠিকানা চাইলে মানাবাড়ি আপনাকে হতাশ করবে না। দার্জিলিংয়ের গ্ল্যামার নেই, কিন্তু পাহাড়ের যে আদিম গন্ধটা আমরা খুঁজি, সেটা এখানে ষোলো আনা আছে। ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ুন, কারণ অফবিট জায়গা বেশিদিন অফবিট থাকে না।


