১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের পর জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল উত্তরাখণ্ডের জাদুং গ্রাম। ৬৪ বছর ধরে ভূতুড়ে গ্রাম হয়েই পড়ে ছিল, ছিল সেনার দখলে। এবার ভাইব্র্যান্ট ভিলেজ প্রকল্পে পর্যটনের হাত ধরে ফের বেঁচে উঠছে এই গ্রাম।

যুদ্ধ সব কেড়ে নেয়। ঘর, সংসার, শৈশব। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধও কেড়ে নিয়েছিল একটি গোটা গ্রামের প্রাণ। উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী জেলার নেলং উপত্যকায় অবস্থিত জাদুং গ্রাম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২,৫০০ ফুট বা ৩৮০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই গ্রামটিই ছিল একসময় ভারত-তিব্বত বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। এখানকার মানুষেরা তিব্বতের সঙ্গে পশম, লবণ, খাদ্যশস্যের ব্যবসা করতেন।

কিন্তু ১৯৬২-র যুদ্ধ সব বদলে দেয়। যুদ্ধের পর নিরাপত্তার কারণে এবং চীন সীমান্তের কাছে হওয়ায় গ্রামটি সম্পূর্ণ খালি করে দেওয়া হয়। গ্রামবাসীদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় হরসিলের কাছে বাগোরি গ্রামে। তারপর থেকে ৬৪ বছর ধরে জাদুং পড়েছিল ভূতুড়ে গ্রাম হয়ে। সেনাবাহিনীর কড়া নজরদারিতে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পাথরের তৈরি ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলো ভেঙে পড়ছিল, উঠোনে জমছিল বরফ, শুধু হাওয়া বইত।

কীভাবে ফিরছে প্রাণ?

অবশেষে প্রাণ ফিরছে জাদুং-এ। কেন্দ্রীয় সরকারের ভাইব্র্যান্ট ভিলেজ প্রোগ্রাম-এর হাত ধরে এই সীমান্ত গ্রামগুলিকে নতুন করে সাজানো হচ্ছে। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল সীমান্তের জনশূন্য গ্রামগুলিতে ফের জনবসতি ফিরিয়ে আনা এবং পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয়দের আয় বাড়ানো।

সরকারের পরিকল্পনা কী? এই গ্রামকে একটি নতুন ও অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। ইতিমধ্যেই এখানে ৬টি হোমস্টে তৈরি করা হয়েছে, যার দায়িত্বে থাকবেন পুরনো গ্রামবাসীদের পরিবারের সদস্যরাই। পুরনো পাথর ও কাঠের বাড়িগুলিকে একই আদলে মেরামত করা হচ্ছে। পর্যটকরা এখানে এসে থাকতে পারবেন, স্থানীয় জাদ-ভোটিয়া জনজাতির সংস্কৃতি, তাদের হাতে তৈরি উলের পোশাক, স্থানীয় খাবার ও হিমালয়ের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

পর্যটকরা কীভাবে যাবেন?

শুধু জাদুং নয়, এর পাশের নেলং গ্রামকেও পর্যটনের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে। এই পুরো এলাকাটা গঙ্গোত্রী ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে পড়ে। এখানে যেতে গেলে উত্তরকাশী জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ইনার লাইন পারমিট নিতে হবে। হরসিল থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে এই গ্রাম। রাস্তা খুবই দুর্গম, কিন্তু সৌন্দর্য স্বর্গের মতো।

প্রশাসনের আশা, পর্যটন শুরু হলে যে ৩৪টি পরিবার ৬৪ বছর আগে গ্রাম ছেড়েছিল, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম ফের গ্রামে ফিরে আসবে। কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ভূতুড়ে গ্রামের তকমা ঘুচে জাদুং ও ফের হয়ে উঠবে জীবন্ত। সীমান্তে ভারতের উপস্থিতিও আরও মজবুত হবে।

এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু পর্যটকদের থাকার জায়গা তৈরি করা নয়। ১৯৬২ সালের পর যাঁদের পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল, তাঁদের জন্য স্থানীয়ভাবে আয়ের সুযোগ তৈরি করাও এর অন্যতম লক্ষ্য। পর্যটন দফতরের তরফে আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনা ও বিপণন সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।