শিবের জন্ম নিয়ে আজও কোনও কাহিনি পাওয়া যায় না। শিবপুরাণ থেকে শুরু করে আরও নানা পুরাণ গ্রন্থে শিবের বিভিন্ন কাহিনি স্থান পেলেও তার জন্ম কীভাবে অথবা তার পিতাই বা কে! এই নিয়ে কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। তবে, পুরাণ কাহিনি অবলম্বনে এমন কিছু তথ্য মেলে যেখান থেকে শিবের জন্ম নিয়ে একটা অনুমেনিয় তথ্য পাওয়া যায়। জন্ম নিয়ে এত গভীর রহস্য থাকলেও শিবকে সমস্ত হিন্দু শাস্ত্রেই সর্বোচ্চ দেবতা হিসাবে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। শিবকে জন্মরহিত, শাশ্বত, সর্বকারণের কারণ হিসাবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাঁকে সমস্ত জ্যোতির জ্যোতি, তুরীয় এবং অন্ধকারের অতিত এবং আদি ও অন্তবিহীন বলেও ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। পরিস্কারভাবে বাংলায় শিবকে ব্যাখ্যা করলে বলতে হয় যখন আলো ছিল না, অন্ধকারও ছিল না, দিনও ছিল না, রাত্রিও ছিল না, সৎ ছিল না, অসৎও ছিল না- তখন একমাত্র ছিলেন। আর এই তিনি হলেন শিব।
'আমি, তুমি এই ব্রহ্মা এবং রুদ্র নামে যিনি উৎপন্ন হবেন, এই সকলেই এক। এদের মধ্যে কোনও ভেদ নেই। ভেদ থাকলে বন্ধন হত। তাই আমার শিবরূপ সনাতন এবং সকলের মূল স্বরূপ বলেই পরিচিত। যা সত্য জ্ঞান এবং অনন্তের স্বরূপ।'
211
বিষ্ণু এবং তার বিভিন্ন অবতার সবসময়েই শিবের উপাসানা করতেন। এমনতী শ্রীকৃষ্ণের পরম আরাধ্য ছিলেন শিব। এই সর্বোচ্চ দেবাদিদেবের বরেরই বিষ্ণু শ্রীকৃষ্ণের জন্ম প্রাপ্ত হয়েছিলেন। পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে শিব-ই লীলাচ্ছলে ব্রহ্মাকে জন্ম দিয়েছিলেন। এমনকী বিষ্ণু-র রূপও শিব-এর আর এক শক্তির প্রকাশ।
311
বৈদান্তিক বেদে বলা হয়েছে শিব এব কেবলঃ। এর মানে সৃষ্টির আগে একমাত্র শিবই বর্তমান ছিলেন। সর্বেচ্চ স্তরে শিবকে সর্বোৎকর্ষ, অপরিবর্তনশীল পরম ব্রহ্ম মনে করা হয়। ব্রহ্ম স্বরূপে পরমাত্মা শিব বিন্দুর ন্যায় অর্থাৎ নিরাকার। এই পরিস্থিতিতে শিবকে কল্পনাও করা যায় না। তিনি কালচক্র এবং সংসারের সকল গুণ-অগুণ-এর ঊর্ধ্বে।
411
ত্রিশক্তি মানে ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিব। আর এরমধ্যে শিবকেই সবার সেরা হিসাবে ধরা হয়। তিনি হিন্দুধর্মের তিনটি সর্বাধিক প্রাচীন সম্প্রদায়ের অন্যতম শৈব সম্প্রদায়ের প্রধান দেবতা। এছাড়াও স্মার্ত সম্প্রদায়ের আরাধ্য পাঁচ প্রধান রূপে অর্থাৎ গণেশ, শিব, সূর্য, বিষ্ণু এবং দূর্গা-এর মিলিচত একটি রূপ। শিবের বিশেষ রুদ্ররূপে নেমে আসে প্রলয় এবং ধ্বংস, সংহার।
511
শিবের অনেকগুলি সদাশয় এবং ভয়ঙ্কর মূর্তি আছে। সদাশয় রূপে তিনি একজন সর্বজ্ঞ যোগী। তিনি কৈলাসে সন্নাসির জীবন-যাপন করেন। আবার গৃহস্থ রূপে তিনি পার্বতীর স্বামী। তাঁর দুই পুত্র গণেশ ও কার্তিক। দুই মেয়ে লক্ষ্মী ও সরস্বতী। ধ্বংসরূপে তাঁকে প্রায়ই দৈত্যবিনাশী বলে অভিহিত করা হয়।
611
শিবকে যোগ-ধ্যান ও শিল্পকলার দেবতা বলেও মনে করা হয়। এছাড়াও বেশকিছু পুরাণ গ্রন্থে শিবকে চিকিৎসাবিদ্যা ও কৃষিবিদ্যারও আবিষ্কারক বলেও অভিহিত করা হয়। আবার এমনও বলা হয় যে বিষ্ণর মতো শিবও এক উচ্চস্থানীয় দেবতা। তাঁর নামানুসারেই শৈব ধর্ম নামক ধর্মীয় মত এবং সম্প্রদায়ের নামকরণ হয়েছে।
711
শিবের যে বৈশিষ্ট্যগুলি সকলের নজর টানে তা হল তার ত্রিনয়ন, গলায় বাসুকী নাগ, জটায় অর্ধচন্দ্র, জটার উপর থেকে প্রবাহিত গঙ্গা, ত্রিশূল এবং বাদ্য ডমরু। শিবকে সাধারণত শিবলিঙ্গ নামক একটি বিমূর্ত প্রতীকেই পুজো করা হয়। ভারত ছাড়াও নেপাল, বাংলাদেশ, পাকিস্তানের কিছুটা অংশ, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কাতেও শিবপুজোর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।
811
শিব আসলে সংস্কৃত শব্দ। এর মানে হল মঙ্গলময়। সংস্কৃতে শৈব শব্দটির অর্থ শিব সংক্রান্ত। এই শব্দটি হিন্দুধর্মের অন্যতম একটি শাখা সম্প্রদায় এবং সেই সম্প্রদায়ের মতাবলম্বীদের নাম হিসাবে ব্যবহৃত হয়। শৈবধর্মকে আবার হিন্দু ধর্মের প্রবেশদ্বার হিসাবেও ব্যাখ্যা করা হয়।
911
নটরাজ বেশে শিবের মূর্তি অত্যন্ত জনপ্রিয়। কথিত আছে নৃত্য ও সঙ্গীত শিবের সৃষ্টি, তিনিই এই নৃত্যকলার প্রর্বতক। সহস্রনামে শিবের নর্তক ও নিত্যনর্ত নামদুটি পাওয়া যায়। পৌরাণিক যুগের থেকেই নৃত্য ও সঙ্গীতের সঙ্গে শিবের যোগ বিদ্যমান।
1011
পূরাণে কথিত আছে, শিব যখন ক্ষিপ্ত হন তখনই তার এই রূপ প্রকাশ্যে আসে৷ তাঁর মূর্তির মধ্যে ধ্যানমগ্ন অবস্থা বা মায়াসুরের পিঠে তাণ্ডবনৃত্যরত অবস্থার মূর্তি যা নটরাজ মূর্তি নামেই বেশি প্রচলিত। মহাকাব্য অনুযায়ী, এই নটরাজই নৃত্যের প্রবর্তক৷ এর পাশাপাশিই সমগ্র বিশ্বই নটরাজের নৃত্যের স্থান৷ তবে, শুধুমাত্র তিনি তাণ্ডবনৃত্যই করতেন না, তিনি হলেন একজন পর্যবেক্ষকও৷ নটরাজ সমস্ত ধার্মিক কার্যকলাপের মিলিত রূপ৷
1111
নটরাজ বেশে শিবের মূর্তি অত্যন্ত জনপ্রিয়। কথিত আছে নৃত্য ও সঙ্গীত শিবের সৃষ্টি, তিনিই এই নৃত্যকলার প্রর্বতক। সহস্রনামে শিবের নর্তক ও নিত্যনর্ত নামদুটি পাওয়া যায়। পৌরাণিক যুগের থেকেই নৃত্য ও সঙ্গীতের সঙ্গে শিবের যোগ বিদ্যমান। সমগ্র ভারতে, বিশেষত তামিলনাডুতে, নটরাজের নৃত্যরত মূর্তি সমগ্র ভারতবর্ষে পাওয়া যায়। শিবের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত দুটি নৃত্যের নাম হল তাণ্ডব ও লাস্য। তাণ্ডব ধ্বংসাত্মক এবং পুরুষালি নৃত্য। শিবই কাল-মহাকাল বেশে বিশ্বধ্বংসের উদ্দেশ্যে এই নাচ নাচেন। লাস্য মধুর ও সুচারু নৃত্যকলা। এই আবেগময় নৃত্যকে পার্বতীর নাচরূপে কল্পনা করা হয়। লাস্যকে তাণ্ডবের নারীসুলভ বিকল্প বলেও মনে করা হয়। তাণ্ডব ও লাস্য নৃত্য যথাক্রমে ধ্বংস ও সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।