অন্ধ্রপ্রদেশের কাডাপা জেলায় কোভিডের নতুন ভ্যারিয়েন্ট 'RF.5' শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য দপ্তর সতর্কতা জারি করেছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এটি ওমিক্রনের একটি সাব-ভ্যারিয়েন্ট। আপাতত চিন্তার কারণ না থাকলেও বয়স্ক এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

অমরাবতী: ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়ার পর কোভিড-১৯ ভাইরাস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। কিন্তু এবার সেই ভাইরাসই নতুন রূপে ফিরে এল প্রতিবেশী রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশে। রাজ্যের কাডাপা জেলায় পাওয়া কোভিড পজিটিভ নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং (Genome Sequencing) করার পর ওমিক্রনের নতুন সাব-ভ্যারিয়েন্ট 'RF.5' শনাক্ত হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সত্যকুমার যাদব নিজে এই খবর জানিয়েছেন।

এই খবরে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক ছড়ালেও, স্বাস্থ্য আধিকারিক এবং চিকিৎসকরা আপাতত ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই বলে আশ্বাস দিয়েছেন। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেই অন্ধ্রপ্রদেশে করোনায় ৪ জনের মৃত্যু হয় এবং বেশ কিছু সক্রিয় কেস ছিল। তার মধ্যেই এই নতুন ভ্যারিয়েন্টের হদিশ মিলল।

পুণের ভাইরোলজি ল্যাব থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে

সম্প্রতি কাডাপা জেলায় করোনার উপসর্গ দেখা দেওয়ায় চার ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেই নমুনা পুণেতে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকারের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজি (NIV)-তে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। জিনোম সিকোয়েন্সিং রিপোর্টে ওই চারজনের শরীরেই ওমিক্রনের নতুন সাব-ভ্যারিয়েন্ট RF.5-এর উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিশ্বজুড়ে ওমিক্রনের যে একাধিক সাব-ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে, RF.5 তার মধ্যে একটি।

কী এই ওমিক্রন RF.5 ভ্যারিয়েন্ট?

এলাইট কেয়ার ক্লিনিকের কনসালট্যান্ট চিকিৎসক ডঃ পাল্লেটি শিব কার্তিক রেড্ডির মতে, "RF.5 হল ওমিক্রনের একটি রিকম্বিন্যান্ট (Recombinant) সাব-ভ্যারিয়েন্ট। যখন দুটি কাছাকাছি গোত্রের করোনাভাইরাস নিজেদের জেনেটিক উপাদান (Genetic Material) বিনিময় করে, তখন এই ধরনের রিকম্বিন্যান্ট ভ্যারিয়েন্টের জন্ম হয়। এটা ভাইরাসের টিকে থাকার জন্য প্রাকৃতিক বিবর্তনেরই একটি অংশ। নতুন ভ্যারিয়েন্ট মানেই যে তা বেশি বিপজ্জনক, এমনটা নয়।"

নজরদারি বাড়িয়েছে স্বাস্থ্য দপ্তর

নতুন ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হওয়ার পরেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী সত্যকুমার যাদব উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন। স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ জুলাই পর্যন্ত রাজ্যে মোট ১৬টি সক্রিয় কোভিড কেস রয়েছে, যার মধ্যে ১২টি নতুন। অন্ধ্রপ্রদেশের মেডিক্যাল এডুকেশন ডিরেক্টর ডঃ বিষ্ণুবর্ধন জানিয়েছেন, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে হাসপাতালগুলিতে আইসোলেশন ওয়ার্ড, বেড, টেস্টিং কিট এবং জরুরি ওষুধপত্র প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা কেন এই ভ্যারিয়েন্টের উপর নজর রাখছেন?

RF.5 ভ্যারিয়েন্টের এমন কিছু জেনেটিক মিউটেশন রয়েছে, যা আগের সংক্রমণ বা টিকার মাধ্যমে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডিকে ফাঁকি দিয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। ঠিক এই কারণেই বিজ্ঞানীরা এর উপর কড়া নজর রাখছেন। তবে চিকিৎসকদের মতে, মানুষের শরীরের 'টি-সেল' (T-Cell) গুরুতর অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়। তাই ভাইরাসটি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে পুরোপুরি ফাঁকি দিতে পারবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশেও এই ভ্যারিয়েন্ট দেখা গেছে।

লক্ষণ কী? কাদের ঝুঁকি বেশি?

এই নতুন ভ্যারিয়েন্টের লক্ষণ সাধারণ সিজনাল ফ্লু-এর মতোই। আক্রান্তদের মধ্যে জ্বর, গলা ব্যথা, একটানা কাশি, ক্লান্তি, মাথাব্যথা এবং গায়ে-হাতে ব্যথা দেখা যেতে পারে। সুস্থ ব্যক্তিরা দ্রুত সেরে উঠবেন। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডঃ জগদীশ হিরেমাঠের মতে, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাঁদের ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্রনিক সমস্যা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাঁদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে।

এখনকার ভ্যাকসিন কি কাজ করবে?

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, অবশ্যই কাজ করবে। নতুন ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে বর্তমান ভ্যাকসিনগুলি হয়তো সংক্রমণ পুরোপুরি আটকাতে পারবে না, কিন্তু রোগের তীব্রতা কমাতে এবং হাসপাতালে ভর্তি বা মৃত্যুর ঝুঁকি এড়াতে এই টিকাগুলি অত্যন্ত কার্যকর। তাই ভ্যাকসিন নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।

বিশেষজ্ঞদের শেষ কথা হল, RF.5 শনাক্ত হওয়া মানে জিনোমিক নজরদারির সাফল্য, কোনও জরুরি অবস্থা নয়। সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে মাস্ক পরা, হাত পরিষ্কার রাখা এবং অসুস্থ বোধ করলে আইসোলেশনে থাকার মতো সতর্কতা মেনে চলতে হবে।