নেপালে ভয়াবহ বন্যার পর মর্গে আর জায়গা নেই। তাই রাজধানী কাঠমান্ডুতেও গণকবর দেওয়া শুরু হয়েছে। পরিচয়হীন দেহগুলি ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে কবর দেওয়া হচ্ছে, যাতে পরে পরিবারকে হস্তান্তর করা যায়।
নেপালে ভয়াবহ বন্যার পরে কেটে গেল প্রায় এক সপ্তাহ। কিন্তু এখনও উদ্ধার হচ্ছে মৃতদেহ। স্বজন হারাদের কান্না এখনও ত্রিশুলী-সহ একাধিক গ্রামে। এই অবস্থায় মর্গে আর মৃতদেহ রাখার জায়গা নেই। এই পরিস্থিতিতে এবার রাজধানী কাঠমান্ডুতেও গণকবর দেওয়া শুরু হয়েছে।
কাঠমাণ্ডুতে গণকবর
ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম বা পিপিই পরা নিরাপত্তা কর্মীরা দেহগুলি কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছেন। কাঠমান্ডুর উপকণ্ঠে গোর্কণা বনাঞ্চলে সেই দেহগুলি কবর দেওয়া হচ্ছে। বৃষ্টির মধ্যেই কাদামাখা জঙ্গলপথ দিয়ে হেঁটে দেহগুলি নিয়ে যাচ্ছেন কর্মীরা। কবর দেওয়ার পর সেগুলিতে বিশেষ চিহ্ন লাগিয়ে রাখা হচ্ছে। দেহগুলির সঙ্গে ট্যাগও দেওয়া থাকছে। পরে শনাক্ত করা গেলে যাতে দেহগুলি কবর থেকে তুলে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া যায়, সেই কারণেই এই ব্যবস্থা।
DNA নমুনা সংগ্রহ
কবর দেওয়ার আগে প্রতিটি দেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। পরিবারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার জন্যই এই পদক্ষেপ। ভোটকোশী নদীর বন্যায় ভেসে যাওয়া মৃতদেহগুলি নদীর স্রোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভেসে আসছে। হাসপাতালগুলি এই বিপুল সংখ্যক দেহ সংরক্ষণ করতে এবং তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে।
সারা দেশে নেপালের মর্গগুলিতে প্রায় ৩৫০টি দেহ রাখার ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বন্যার পর সেই জায়গা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। ফলে পরিবার শনাক্ত করার আগে পর্যন্ত দেহগুলি রাখার মতো পরিস্থিতি নেই। রাসুওয়া এবং নুওয়াকোট থেকে বন্যায় ভেসে যাওয়া দেহগুলি দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে।
দেহ উদ্ধার আর সৎকার
চিতওয়ান জেলা, যা একটি নিচু এলাকা, সেখান থেকে সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ৩২১টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানকার মর্গগুলি ইতিমধ্যেই ভরে গেছে। এই কারণে কর্তৃপক্ষকে অস্থায়ী ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ 'অশনাক্ত এবং দাবিহীন দেহ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা, ২০২১' অনুযায়ী দেহগুলির সৎকার করছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, জেলা পুলিশ প্রধানের নেতৃত্বে একটি কমিটি দেহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকে। মর্গে জায়গা না থাকায় সরকার 'অশনাক্ত এবং দাবিহীন দেহ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা, ২০২১' সংশোধন করে পরিচয়হীন দেহগুলির ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করেছে।
একটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেপাল পুলিশ আইন, ১৯৫৫-এর ধারা ২২(এ)-এর উদ্দেশ্যে এই নির্দেশিকা সংশোধন করা হয়। সরকার মূলত নির্দেশিকার ১৪ নম্বর ধারা সংশোধন করেছে, যেখানে দুর্যোগে মৃত ব্যক্তিদের জন্য ময়নাতদন্তের নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যদি দুর্যোগে মৃত কোনও ব্যক্তির দেহ বা তার অংশ পাওয়া যায় এবং প্রাথমিক শারীরিক পরীক্ষায় যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে মৃত্যু দুর্যোগের কারণেই হয়েছে, তবে ময়নাতদন্তে শুধুমাত্র পরিচয় শনাক্তকরণের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হবে।
উপ-ধারা (১)-এ একটি নতুন নিয়ম যোগ করা হয়েছে। এর ফলে, পরিচয়হীন বা দাবিহীন দেহ, দেহের অঙ্গ বা অংশ সৎকার করার আগে ডিএনএ-সহ প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে রাখতে হবে। একইভাবে, উপ-ধারা (২)-এ বলা হয়েছে যে পরিচয়হীন বা দাবিহীন দেহগুলি শনাক্তকরণের জন্য চিহ্ন লাগিয়ে নিরাপদে মাটির নিচে রাখা যেতে পারে। উপ-ধারা (৩)-এ যোগ করা হয়েছে যে, যদি পরে সংরক্ষিত দেহের কোনও দাবিদার পাওয়া যায়, তবে সেই দেহ, অঙ্গ বা অংশ তাদের হাতে তুলে দিতে হবে। আগের নির্দেশিকা অনুযায়ী, পরিচয়হীন এবং দাবিহীন দেহগুলি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাছের হাসপাতাল বা মর্গে সুরক্ষিত রাখার নিয়ম ছিল।
এই পরিস্থিতির পর সরকার নির্দেশিকায় বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। 'দেহ ব্যবস্থাপনা' বলতে এখন থেকে সম্পূর্ণ সৎকার না করে অস্থায়ী ব্যবস্থাপনাকে বোঝানো হবে। ২০২১ সালের নির্দেশিকায় 'দাবিহীন দেহ' বলতে বোঝানো হত, যার আত্মীয় বা দাবিদার খুঁজে পাওয়া যায়নি। সরকার নির্দেশিকার ১০ নম্বর ধারা সংশোধন করে স্পষ্ট করেছে যে 'দেহ' বলতে দেহের কোনও অঙ্গ বা অংশকেও বোঝানো হবে। একইভাবে, সরকার ১১ নম্বর ধারাও সংশোধন করেছে। এখন থেকে সৎকার বা সমাধিস্থ করার পাশাপাশি 'দেহ ব্যবস্থাপনা' শব্দটিও ব্যবহার করা হবে। দুর্যোগে মৃত ব্যক্তিদের দেহ জেলা বিপর্যয় মোকাবিলা কমিটির দ্বারা নির্ধারিত স্থানে সৎকার করা হবে।


