ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন যে, রাশিয়া মার্কিন ও উপসাগরীয় দেশের ঘাঁটিতে হামলার জন্য ইরানকে স্যাটেলাইট তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, মস্কো উত্তর কোরিয়া থেকে ৩০,০০০ সেনা এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল লঞ্চার পাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
শনিবার সন্ধ্যায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে একগুচ্ছ মারাত্মক অভিযোগ আনলেন। তিনি দাবি করেছেন, মস্কো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর পরিকাঠামোয় হামলার জন্য ইরানকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে। শুধু তাই নয়, রাশিয়া তার বাহিনীকে শক্তিশালী করতে উত্তর কোরিয়া থেকে ৩০,০০০ সেনা আনার প্রস্তুতিও নিচ্ছে।
ইরানকে স্যাটেলাইট তথ্য দিয়ে সাহায্যের অভিযোগ
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম X-এ জেলেনস্কি এই বিষয়ে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, ইউক্রেনের গোয়েন্দারা জানতে পেরেছে যে উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং পরিকাঠামোর উপর রাশিয়ার স্যাটেলাইটগুলো লাগাতার নজরদারি চালাচ্ছে। আর সেই তথ্যই তুলে দেওয়া হচ্ছে ইরানের হাতে। জেলেনস্কি বলেন, "আমি আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাকে নির্দেশ দেব রাশিয়ার এই নতুন সাহায্যের বিষয়ে আমাদের শরিক দেশগুলোকে সব তথ্য জানাতে। জুলাই মাসের শুরু থেকেই আমরা দেখছি, রাশিয়ার স্যাটেলাইটগুলো উপসাগরীয় দেশ এবং সেখানকার মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর উপর নজর রাখছে। পরে সেই ছবিই ইরানের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।"
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের মতে, রাশিয়ার এই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং ইরানের সামরিক পদক্ষেপের মধ্যে একটা স্পষ্ট যোগসূত্র রয়েছে। তিনি বলেন, "এইসব জায়গায় ইরানের হামলার আগে ও পরে রাশিয়ার স্যাটেলাইট ছবির সঙ্গে হামলার ঘটনার একটা পরিষ্কার মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। হামলার প্রস্তুতির জন্য এবং পরে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বুঝতে এই ছবিগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।" জেলেনস্কি নির্দিষ্ট করে বলেন, শুধুমাত্র ১৯ এবং ২০ জুলাই রাশিয়ার স্যাটেলাইটগুলো চারটি আঞ্চলিক বিমানঘাঁটির উপর নজর রেখেছিল, যার মধ্যে দুটি বাহরাইনে, একটি জর্ডানে এবং একটি কুয়েতে অবস্থিত।
উত্তর কোরিয়ার সেনায় বাহিনী ভরানোর ছক
অন্যদিকে, পিয়ংইয়ংয়ের উপর মস্কোর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা নিয়েও মুখ খোলেন জেলেনস্কি। তিনি সতর্ক করে বলেন, রাশিয়া বিপুল সংখ্যক উত্তর কোরীয় সেনাকে নিজেদের দেশে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং তাদের থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রও কিনছে। তিনি বলেন, "রাশিয়া উত্তর কোরিয়া থেকে আরও ৩০,০০০ সেনা পেতে চায়। জুন মাস থেকে রাশিয়ার ভোরোনেঝ অঞ্চলে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। উত্তর কোরিয়াও রাশিয়াকে অতিরিক্ত ব্যালিস্টিক মিসাইল লঞ্চার পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।"
জেলেনস্কি জোর দিয়ে বলেন, এই জোট ইউরোপের সীমানা ছাড়িয়ে এক গভীর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংকট তৈরি করছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "এই বিপদ শুধু ইউক্রেনের জন্য নয়। রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে যুদ্ধ করতে শেখাচ্ছে, তাদের অস্ত্র উন্নত করছে এবং সেই অস্ত্র ব্যবহারের বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জনে সাহায্য করছে। এশিয়ার যে সমস্ত দেশ উত্তর কোরিয়ার মিসাইলের আওতায় রয়েছে, তাদের সকলের জন্যই এটা একটা বড় বিপদ।"
ইউক্রেনের কৃষি পরিকাঠামোয় হামলা
দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, রুশ বাহিনী সুমির মতো অঞ্চলে deliberatly কৃষিক্ষেত্র এবং শস্য উৎপাদন কেন্দ্রগুলিতে হামলা চালাচ্ছে। যুদ্ধের শুরুতে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম বাড়ানোর জন্য তারা যে কৌশল নিয়েছিল, এটা তারই পুনরাবৃত্তি। জেলেনস্কি বলেন, "নিষ্ঠুর হামলা চালানোর এই কৌশল রাশিয়ার ইচ্ছাকৃত।" তিনি জানান, ইউক্রেনের বিদেশ মন্ত্রককে আন্তর্জাতিক বন্ধুদের এই বিষয়ে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। "কৃষ্ণসাগর অঞ্চল থেকে শস্য রপ্তানিতে রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞার কারণে মিশর, লিবিয়া এবং আরও অনেক দেশের মানুষের জীবনযাত্রার খরচ ফের বাড়তে পারে, কারণ এই দেশগুলো শস্য আমদানির উপর নির্ভরশীল।"
রাশিয়ার এই ক্রমবর্ধমান জোট এবং অবরোধ কৌশলের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান জেলেনস্কি। তিনি বিশ্ব নেতাদের এই সংঘাতের বাড়তে থাকা পরিধিকে উপেক্ষা না করার অনুরোধ করেন। জেলেনস্কি শেষে বলেন, "আমাদের কারোরই এই সহজ সত্যিটা থেকে চোখ ফেরানো উচিত নয়: শয়তান সবসময় পরিস্থিতি আরও খারাপ করার এবং নিজেকে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার পথ খোঁজে। রাশিয়াকে আটকাতে হবে। এই যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। আগ্রাসীর উপর চাপ তৈরি করতেই হবে।"
ট্রাম্পের আস্থা রাশিয়া ও চিনের প্রতিশ্রতিতে
জেলেনস্কির এই মন্তব্যের ঠিক আগেই, শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চিন ও রাশিয়াকে ইরানের কাছে অস্ত্র সরবরাহ করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। তবে তিনি চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দেওয়া প্রতিশ্রুতির উপর আস্থা প্রকাশ করে বলেন, এই দুই দেশ বর্তমানে তেহরানকে কোনও সামরিক সাহায্য করছে না।
ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে একটি পোস্টে জানান, বেইজিং এবং মস্কো উভয়ই ইরানকে অস্ত্র না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই অবস্থান থেকে সরে এলে তার গুরুতর পরিণতি হবে। ট্রাম্প লেখেন, "অতএব, ইরানের প্রসঙ্গে যে দুটি বড় দেশের কথা প্রায়ই বলা হয়, আমার মতে তারা এতে অংশ নিচ্ছে না। যদি তারা তা করত, তবে তাদের জন্য খুব খারাপ হতো। এটা অবশ্যই তাদের স্বার্থের অনুকূলে নয়।" মার্কিন স্থাপনায় একাধিক হামলার পর ওয়াশিংটন যখন খতিয়ে দেখছে যে রাশিয়া ও চিন ইরানকে টার্গেটিং ইন্টেলিজেন্স দিয়ে সাহায্য করেছে কিনা, ঠিক তখনই ট্রাম্প এই মন্তব্য করলেন।


