২০৪৭ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি বা জিএসডিপি ঠিক কী কী শর্ত পূরণ করলে ৫ গুণ বাড়তে পারে, তা নিয়ে একটি বিশেষ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ওআরএফ)।
২০৪৭ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি বা জিএসডিপি ঠিক কী কী শর্ত পূরণ করলে ৫ গুণ বাড়তে পারে, তা নিয়ে একটি বিশেষ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ওআরএফ)। রিপোর্টটির নাম দেওয়া হয়েছে 'বিকশিত বঙ্গ: অ্যান এভিডেন্স-বেসড পলিসি রোডম্যাপ ফর ওয়েস্ট বেঙ্গলস ৫এক্স ইকোনমি' (Bikoshito Bongo: An Evidence-Based Policy Roadmap for West Bengal’s 5X Economy)।
নীলাঞ্জন ঘোষ, আর্য রায় বর্ধন, কুমকুম মোহতা এবং দিয়া শাহ এই রিপোর্টটি তৈরি করেছেন। তাঁরা বলছেন, রাজ্যের আর্থিক বৃদ্ধিতে একটা বড়সড় ঘাটতি রয়েছে। অর্থনীতিকে ৫ গুণ বড় করতে গেলে প্রতি বছর ৭.২৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি দরকার। কিন্তু ২০১১-১২ থেকে ২০২৪-২৫ সাল পর্যন্ত রাজ্যের বৃদ্ধির হার আটকে রয়েছে ৪.৬৯ শতাংশে।
বর্তমানে শুধুমাত্র ম্যানুফ্যাকচারিং এবং অন্যান্য পরিষেবা খাত এই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হারে এগোচ্ছে। অন্যদিকে, রাজ্যের মোট আয়ের ২২.২৪ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। অথচ কৃষিক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার মাত্র ২.৮৯ শতাংশ। উৎপাদন, পরিকাঠামো, শ্রম, সরকারি অর্থভাণ্ডার এবং রাজ্যের নিজস্ব ক্ষমতার মতো জায়গাগুলোতে বেশ কিছু বাধা রয়েছে বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে।
ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে মূলত ছোট বা নিজস্ব উদ্যোগের সংখ্যাই বেশি, আর সেখানে উৎপাদনের ঘাটতিও চোখে পড়ার মতো। কৃষিতে আবার সবজি, মাছ আর আলু উৎপাদনে রাজ্য বেশ শক্তিশালী। কিন্তু ফসল ওঠার পর সঠিক সংরক্ষণের অভাব, দুর্বল প্রসেসিং এবং ঠিকঠাক কেনাবেচার ব্যবস্থা না থাকায় প্রচুর ক্ষতি হয়ে যায়।
রাজ্যের আয়ের একটা বড় অংশ আসে পরিষেবা খাত থেকে। তবে পর্যটন এবং ডিজিটাল অর্থনীতি এখনও সেভাবে ডানা মেলতে পারেনি। জমি অধিগ্রহণের সমস্যা আর ভাঙাচোরা পরিকাঠামোর কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থাও ধাক্কা খাচ্ছে। পাশাপাশি, রাজকোষে চাপ থাকায় সরকারি বিনিয়োগের সুযোগও কমে যাচ্ছে বলে ওআরএফ-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধির জন্য রিপোর্টে ৬টি মূল স্তম্ভের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো— উৎপাদনের ধরন বদলানো, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, আর্থিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ। এই লক্ষ্যগুলো ছোঁয়ার জন্য নির্দিষ্ট টার্গেট আর তা বাস্তবায়নের উপায়ও বাতলে দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬-২৭ সালের রাজ্য বাজেটেও এই বিষয়গুলোর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সেখানে চিরাচরিত ভর্তুকির বদলে উৎপাদন বাড়ানো, পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া এবং মূলধন তৈরির দিকে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগ টানাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেটা সামলাতে বাজেটে ৫ হাজার কোটি টাকার 'ইনভেস্টমেন্ট ইনসেনটিভ পলিসি' বা বিনিয়োগ উৎসাহ প্রকল্প আনা হয়েছে। পাশাপাশি, ১০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জমি, অনুমোদন এবং মূলধন সংক্রান্ত জটিলতা কাটাতে 'সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স সিস্টেম' চালু করা হয়েছে।
মাঝারি শিল্পের ঘাটতি মেটাতে 'বাংলার উদ্যম ক্রেডিট কার্ড', নতুন এমএসএমই (MSME) ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরি এবং পুরনো শিল্পাঞ্চলগুলোকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সুফলও মিলতে শুরু করেছে। ন্যাশনাল হেলথ অথরিটির সঙ্গে রাজ্যের একটি চুক্তি (MoU) হয়েছে। এর ফলে রাজ্যের ১.৪৩ কোটি পরিবার আয়ুষ্মান ভারত (PMJAY) প্রকল্পের আওতায় আসবে। রিপোর্ট অনুযায়ী, এর জেরে প্রতি বছর কেন্দ্র থেকে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার তহবিল পাবে রাজ্য।
পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বড় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। দাদনপাত্রবাড়ের গভীর সমুদ্র বন্দর, ডানকুনি ও শিলিগুড়িতে লজিস্টিক হাব এবং সীমান্তে রফতানি বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও মজবুত করা হচ্ছে।
ওআরএফ-এর রিপোর্ট স্পষ্ট বলছে, এগুলো প্রাথমিক পদক্ষেপ হলেও যথেষ্ট নয়। বাজেটে অনেক কিছুই ঘোষণা করা যায়, কিন্তু আসল কাজ হলো সেটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। বিনিয়োগের প্রস্তাব কত তাড়াতাড়ি একটা চালু কারখানা, কর্মীদের বেতন কাঠামো এবং সাপ্লায়ার নেটওয়ার্কে বদলে যায়, সেটাই এখন আসল পরীক্ষা। পাশাপাশি, ঘোষণার পর সত্যিই কর্মসংস্থান, রফতানি এবং পরিকাঠামো তৈরি হচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।


