হাইড্রোজেন কি সত্যিই বদলে দেবে ভবিষ্যৎ? ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন, গ্রিন হাইড্রোজেন প্রযুক্তি আর ধোঁয়াবিহীন ইঞ্জিন—এই সবকিছুই এক নতুন এনার্জি বিপ্লবের আশা জাগাচ্ছে।

Hydrogen Technology Explained: হাইড্রোজেন হলো বিশ্বের সবচেয়ে হালকা এবং সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া যাওয়া মৌল। মহাবিশ্বের প্রায় ৭৫% সাধারণ পদার্থই হাইড্রোজেন দিয়ে তৈরি। তবে পৃথিবীতে হাইড্রোজেন বেশিরভাগটাই জল (H₂O) এবং অন্যান্য রাসায়নিক যৌগের মধ্যে পাওয়া যায়। তাই ব্যবহারের আগে একে আলাদা করে নিতে হয়। যেমন, জল (H₂O) একটা যৌগ, যা হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন মিলে তৈরি হয়।

হাইড্রোজেনকে ভবিষ্যতের সবচেয়ে পরিষ্কার জ্বালানি বলে মনে করা হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, যখন ফুয়েল সেলে এটি ব্যবহার করা হয়, তখন কোনো ধোঁয়া বা কার্বন ডাই অক্সাইড বের হয় না। এর বদলে শুধু জল আর বাষ্প তৈরি হয়।

হাইড্রোজেন কীভাবে তৈরি হয়?

হাইড্রোজেন বানানোর অনেকগুলো উপায় আছে, তবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলো হলো:

১. জল থেকে হাইড্রোজেন (Electrolysis): এটাকেই সবচেয়ে পরিষ্কার পদ্ধতি বলে মনে করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় জলের (H₂O) মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ পাঠানো হয়। এর ফলে জল দুটি ভাগে ভেঙে যায়—১. হাইড্রোজেন (H₂) এবং ২. অক্সিজেন (O₂)।

যদি এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত বিদ্যুৎ সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি বা জলবিদ্যুৎ থেকে আসে, তাহলে তাকে 'গ্রিন হাইড্রোজেন' (Green Hydrogen) বলা হয়। ব্যাপারটা অনেকটা মোবাইল চার্জ করার জন্য যেমন বিদ্যুৎ লাগে, তেমনই জল থেকে হাইড্রোজেন বের করতেও বিদ্যুৎ প্রয়োজন।

২. প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে হাইড্রোজেন: বর্তমানে সবচেয়ে বেশি হাইড্রোজেন তৈরি হয় প্রাকৃতিক গ্যাস (Natural Gas) থেকে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় 'স্টিম মিথেন রিফর্মিং' (Steam Methane Reforming)। এই উপায়টা সস্তা, কিন্তু এতে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়। তাই এটা পরিবেশের জন্য খুব একটা ভালো নয়।

৩. কয়লা থেকে হাইড্রোজেন: কিছু দেশে কয়লা থেকেও হাইড্রোজেন তৈরি করা হয়। তবে এতে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ হয়, তাই ভবিষ্যতে এর ব্যবহার কমানোর চেষ্টা চলছে।

গ্রিন, ব্লু আর গ্রে হাইড্রোজেনের মধ্যে পার্থক্য কী?

  • গ্রিন হাইড্রোজেন: এটি পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি (Renewable Energy) থেকে তৈরি হয় এবং সবচেয়ে পরিষ্কার বলে মনে করা হয়। একে ক্লিন এনার্জি বা সাসটেইনেবল এনার্জিও বলা হয়। এই শক্তি প্রাকৃতিক উৎসের উপর নির্ভরশীল এবং কখনও শেষ হয় না। যেমন - সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ, জিওথার্মাল এনার্জি।
  • ব্লু হাইড্রোজেন: প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে তৈরি হয়, কিন্তু যে কার্বন ডাই অক্সাইড (CO₂) বের হয়, তা ধরে জমিয়ে রাখা হয়।
  • গ্রে হাইড্রোজেন: প্রাকৃতিক গ্যাস থেকেই তৈরি হয়, কিন্তু CO₂ সরাসরি পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হয়।

ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেনটি আসলে কী?

ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন ১৪০ কোটি ভারতবাসীর একটি স্বপ্নের প্রকল্প। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ডিজেল ট্রেনের বদলে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি নিয়ে আসা। এই ট্রেনে ডিজেল ইঞ্জিনের জায়গায় হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল লাগানো হয়েছে। ফুয়েল সেলে হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন মিলে বিদ্যুৎ তৈরি করে। সেই বিদ্যুৎই ট্রেনের ইঞ্জিনকে চালায়। এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধোঁয়া বের হয় না, শুধু জল তৈরি হয়।

ভারতের হাইড্রোজেন ট্রেন কোন রুটে চলবে?

হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপত সেকশনে প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন চলছে।

ভারতের হাইড্রোজেন ট্রেন কেন এত স্পেশাল?

  • পরিবেশের জন্য সেরা: ডিজেল ইঞ্জিনের তুলনায় এতে কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্য।
  • শব্দ কম: হাইড্রোজেন ট্রেন ডিজেল ট্রেনের চেয়ে অনেক শান্তভাবে চলে।
  • দূষণ কম: এই ট্রেন থেকে ধোঁয়া বা অন্য কোনো ক্ষতিকারক গ্যাস বের হয় না।
  • ভবিষ্যতের প্রযুক্তি: ইউরোপ, জাপান, চিন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পর এখন ভারতও এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দৌড়ে এগিয়ে গিয়েছে।

হাইড্রোজেন ট্রেন কীভাবে চলে?

  • ট্রেনে হাইড্রোজেন গ্যাস ভরা হয়।
  • ফুয়েল সেলে হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন মেশে।
  • এর থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হয়।
  • সেই বিদ্যুৎ ইঞ্জিনকে চালায়।
  • শেষে শুধু জল বেরিয়ে আসে।

ব্যাপারটা এভাবেও বোঝা যায়, যেমন ব্যাটারিচালিত গাড়ি চার্জ দিয়ে চলে, কিন্তু এখানে বিদ্যুৎ চলার পথেই ফুয়েল সেলের মধ্যে তৈরি হতে থাকে।

হাইড্রোজেন ট্রেন কি পুরোপুরি নিরাপদ?

হ্যাঁ। হাইড্রোজেন ট্রেনে একাধিক স্তরের সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে।

  • হাই-প্রেশার সিকিউরিটি ট্যাঙ্ক
  • গ্যাস লিক সেন্সর
  • অটোমেটিক শাটডাউন সিস্টেম
  • ক্রমাগত নজরদারি

ভারতের জন্য হাইড্রোজেন ট্রেন চালানোর তাৎপর্য কী?

ভারত প্রতি বছর বিপুল পরিমাণে ডিজেল আমদানি করে। ভবিষ্যতে হাইড্রোজেন ট্রেনের ব্যবহার বাড়লে...

  • জ্বালানি আমদানি কমবে।
  • দূষণ কমবে।
  • রেলওয়ের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমবে।
  • গ্রিন এনার্জি অভিযান গতি পাবে।
  • দেশ শক্তি ক্ষেত্রে আত্মনির্ভর হয়ে উঠবে।

হাইড্রোজেন ট্রেন নিয়ে কিছু পরিসংখ্যান

  • ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেনের জন্য প্রায় ১,২০০ হর্সপাওয়ারের (HP) একটি হাইড্রোজেন প্রোপালশন সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী হাইড্রোজেন ট্রেন সিস্টেম।
  • হাইড্রোজেনে প্রতি কেজিতে প্রায় ১২০ মেগাজুল (MJ/kg) শক্তি থাকে, যা ডিজেল বা পেট্রোলের চেয়ে প্রায় ৩ গুণ বেশি (ওজন অনুযায়ী)।
  • বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক হাইড্রোজেন ট্রেন নেটওয়ার্ক জার্মানিতে ২০২২ সালে নিয়মিত পরিষেবা শুরু করে।
  • আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA) অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত হাইড্রোজেনের প্রায় ৯৯% এখনও জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি হয়; গ্রিন হাইড্রোজেনের ভাগ খুবই কম।
  • ভারতের 'ন্যাশনাল গ্রিন হাইড্রোজেন মিশন'-এর লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি বছর ৫০ লক্ষ টন গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদন করা।

তথ্যের উৎস: Ministry of Railways India, Ministry of New and Renewable Energy (MNRE), National Green Hydrogen Mission, International Energy Agency (IEA), Indian Railways / RDSO, Hydrogen Council.