Relationship Tips: মানুষের ভুল, দুর্বলতা বা খুঁত চোখে পড়া খুব সহজ। কিন্তু সেই একই মানুষের ভালো গুণ, আন্তরিকতা, পরিশ্রম এবং সম্ভাবনাকে চিনে নেওয়ার মানসিকতাই সম্পর্ককে আরও গভীর করে। গৌরগোপাল দাসের বক্তব্যের সূত্র ধরে লেখাটিতে বোঝানো হয়েছে, একটি ভুল বা খারাপ মুহূর্ত দিয়ে কখনও পুরো মানুষকে বিচার করা উচিত নয়।

Relationships: কাছের মানুষটির একটি ভুল হয়তো আমাদের খুব সহজেই চোখে পড়ে। তাঁর বলা একটি কটু কথা মনে থেকে যায়, কোনও অপূর্ণতা বারবার মনে পড়ে, কিংবা একদিনের খারাপ আচরণ দেখে মনে হয়, 'মানুষটা বুঝি এমনই!' অথচ সেই মানুষটিই হয়তো কতবার নিঃশব্দে পাশে থেকেছেন, কতবার নিজের কথা না ভেবে আমাদের জন্য কিছু করেছেন, তার হিসাবটা আমরা রাখিনি। মানুষের মন বোধহয় এমনই। ভালো মুহূর্তগুলো অনেক সময় স্বাভাবিক বলে মনে হয়, কিন্তু একটি খারাপ ঘটনা স্মৃতিতে গভীর দাগ কেটে যায়। তাই সম্পর্কের টানাপোড়েনে আমরা প্রায়ই মানুষটিকে নয়, তাঁর ভুলটিকেই দেখতে শুরু করি। এই জায়গাতেই একটু থামতে বলেন আধ্যাত্মিক শিক্ষক ও লেখক গৌরগোপাল দাস। তাঁর একটি পরিচিত বক্তব্য, 'Anyone can find the dirt in someone. Be the one that finds the gold.' সহজ করে বললে, কারও খারাপ দিক খুঁজে বের করা খুব কঠিন কাজ নয়; আসল দক্ষতা হল সেই মানুষটির মধ্যেই লুকিয়ে থাকা ভালোত্বটুকু খুঁজে পাওয়া।

প্রতিটি মানুষের মধ্যেই কি ‘সোনা’ লুকিয়ে থাকে? 

‘Gold’ শব্দটি এখানে আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করা হয়নি। বরং এটি মানুষের সেই মূল্যবান দিকগুলির প্রতীক, যা সবসময় বাইরে থেকে দেখা যায় না। কারও অসাধারণ ধৈর্য, কারও দায়িত্ববোধ, কারও পরিশ্রম, কারও মায়া-মমতা, আবার কারও কঠিন পরিস্থিতিতেও হাল না ছাড়ার মানসিকতা—সবই হতে পারে সেই ‘Gold’। সমস্যা হল, এই গুণগুলি দেখতে হলে একটু সময় দিতে হয়। আর ভুল খুঁজে বের করতে সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। একজন সহকর্মী হয়তো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভুল করেছেন। একজন বন্ধু হয়তো প্রয়োজনের সময়ে ফোন ধরতে পারেননি। পরিবারের কেউ হয়তো এমন কিছু বলেছেন, যা আমাদের মনে আঘাত করেছে। সেই ঘটনাগুলিকে অস্বীকার করার কোনও কারণ নেই। কিন্তু তার ভিত্তিতেই কি গোটা মানুষটিকে বিচার করা উচিত? হয়তো সেই সহকর্মীই গত কয়েক মাস ধরে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব সামলেছেন। বন্ধুটিই হয়তো এর আগে অসংখ্য কঠিন সময়ে পাশে ছিলেন। পরিবারের মানুষটিই হয়তো নিজের অনেক প্রয়োজন সরিয়ে রেখে আমাদের জন্য ভেবেছেন। একটি ভুল কখনও কখনও চোখে এত বড় হয়ে ওঠে যে তার পিছনে থাকা অসংখ্য ভালো কাজ আমাদের আর দেখাই যায় না। ভুল ধরিয়ে দেওয়া আর মানুষকে ছোট করা এক নয় কারও ভুলের কথা বলা দরকার হলে অবশ্যই বলতে হবে। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির অর্থ কখনও অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। বরং পার্থক্যটা তৈরি হয় আমরা কীভাবে বিষয়টি বলছি, তার মধ্যে। 'তুমি সবসময় এমনই,' এই কথার মধ্যে মানুষটিকে পুরোপুরি অযোগ্য করে দেওয়ার একটা ইঙ্গিত থাকে। তার বদলে ‘এই কাজটা ঠিক হয়নি, তবে তুমি চাইলে আরও ভালো করতে পারবে,’ এই কথাটি সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে। পরিবারে, বন্ধুত্বে কিংবা কর্মক্ষেত্রে এই সামান্য পার্থক্যই অনেক বড় হয়ে উঠতে পারে। কারণ প্রত্যেক মানুষই চান, তাঁর ভুলের পাশাপাশি তাঁর চেষ্টাটুকুও যেন কেউ দেখতে পান।

প্রশংসা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? 

প্রশংসা মানে শুধু কাউকে খুশি করার জন্য মিষ্টি কথা বলা নয়। সত্যিকারের প্রশংসা একজন মানুষকে জানায়, 'তোমার এই ভালো দিকটা আমি লক্ষ্য করেছি।' এই অনুভূতিটা সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত মূল্যবান। একজন সন্তান যদি শুধু পরীক্ষার নম্বর নিয়ে কথা শোনে, তাহলে তার অন্য প্রতিভাগুলি হয়তো ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। কোনও কর্মী যদি শুধু ভুলের জন্য ম্যানেজারের কাছে পরিচিত হন, তাহলে তাঁর ভালো কাজের আগ্রহ কমতে পারে। একইভাবে, কোনও সম্পর্কেও একজন মানুষ যদি বারবার শুনতে পান তিনি কী কী ভুল করছেন, তাহলে একসময় কথোপকথনের জায়গাটাই সংকুচিত হয়ে যায়। অন্যদিকে, সঠিক সময়ে বলা একটি আন্তরিক প্রশংসা মানুষকে আরও ভালো করার সাহস দিতে পারে।

সম্পর্ক কি নিখুঁত মানুষ দিয়ে তৈরি হয়? 

আসলে কোনও সম্পর্কই নিখুঁত মানুষকে নিয়ে তৈরি হয় না। দু’জন অসম্পূর্ণ মানুষ একে অপরকে বুঝতে শিখতে শিখতেই সম্পর্ক গভীর হয়। তাই দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা শুধু 'সে আমার জন্য কী ভুল করেছে?' হলে চলবে না। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতে হবে, 'সে আমার জন্য কতবার ভালো কিছু করেছে?', 'তার কোন দিকটা আমি এতদিন গুরুত্ব দিইনি?', 'এই মানুষটির মধ্যে এমন কী আছে, যার জন্য সম্পর্কটা এখনও মূল্যবান?' এই প্রশ্নগুলি হয়তো সব সমস্যার সমাধান করবে না। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলে দিতে পারে। হয়তো আজ থেকেই বদলানো যায় পরের বার কোনও পরিচিত মানুষের ভুল চোখে পড়লে একটু থামুন। সঙ্গে সঙ্গে বিচার করার আগে তাঁর অন্য দিকগুলির কথাও মনে করার চেষ্টা করুন। হয়তো এমন কোনও ভালো কাজ মনে পড়বে, যা এতদিন ভুলে গিয়েছিলেন। কারও দুর্বলতা দেখার চোখ আমাদের প্রায় সবারই আছে। কিন্তু তার ভেতরের শক্তিটা খুঁজে বের করার মতো চোখ তৈরি করা একটু কঠিন। সেই চোখ তৈরি করতে লাগে সহানুভূতি, ধৈর্য এবং মানুষকে একটি ঘটনার চেয়ে বড় করে দেখার মানসিকতা। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা কেউই আমাদের সবচেয়ে খারাপ দিনটি নই। আমরা শুধু আমাদের একটি ভুল নই, একটি ব্যর্থতা নই, একটি রাগের মুহূর্ত নই। প্রত্যেকের মধ্যেই এমন কিছু ভালো থাকে, যা হয়তো পৃথিবী দেখেনি, অথচ কোনও একজন মানুষের নজরে সেটিই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে মূল্যবান। হয়তো সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে সুন্দর উপায়ও এটাই, মানুষটির কোথায় দাগ আছে, শুধু সেটি না দেখে, সেই দাগের আড়ালে কতটা আলো এখনও বেঁচে আছে, সেটাও খুঁজে দেখা। কারণ ভুল খুঁজে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু তার ভেতরের ভালোটা খুঁজে নিয়ে হাতটা শক্ত করে ধরে রাখা, সেখানেই হয়তো সত্যিকারের সম্পর্কের সৌন্দর্য।

আরও খবরের জন্য চোখ রাখুন এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।